Thursday, August 20, 2026

স্পোর্টস ডেস্ক: ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা। ১৯ জুলাই, নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফয়সালা হবে— কে হবে ফুটবল বিশ্বের নতুন সম্রাট, স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা। কিন্তু মাঠের এই লড়াইয়ের বাইরেও একটা লড়াই চলছে, যেটা নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না— অর্থের লড়াই। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী আসর, আর সেই ধনরত্নের সবচেয়ে বড় ভাগ অপেক্ষা করছে আগামীকালের বিজয়ীর জন্য।

কত টাকা পাবে চ্যাম্পিয়ন দল?

আসুন সরাসরি সংখ্যায় যাওয়া যাক। ২০২৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পারফরম্যান্স পুরস্কার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ভারতীয় মুদ্রায় এই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা। এখানেই শেষ নয়— প্রতিটি দল টুর্নামেন্টে যোগ্যতা অর্জন করেই একটি নির্দিষ্ট প্রস্তুতি অনুদান পেয়ে যায়, যা যোগ হলে চ্যাম্পিয়ন দেশের মোট প্রাপ্তি ছাড়িয়ে যায় ৫৩ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এত বড় অঙ্ক আগে কখনও কোনও দেশ পায়নি।

রানার্স-আপ দলের জন্যও কম নয় প্রাপ্তি— ৩৩ মিলিয়ন ডলার। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানাধিকারী দল পাবে যথাক্রমে ২৯ ও ২৭ মিলিয়ন ডলার। আর যে দলগুলো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে, তারাও শূন্য হাতে ফেরেনি— ন্যূনতম ৯ মিলিয়ন ডলার পারফরম্যান্স পুরস্কারের পাশাপাশি প্রস্তুতি বাবদ আলাদা অর্থও পেয়েছে তারা। মোট কথা, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মাত্রই একটি দেশের নিশ্চিত প্রাপ্তি ছাড়িয়ে যায় ১২ মিলিয়ন ডলার।

এবারের আসরে সব মিলিয়ে ৪৮টি দেশ অংশ নিয়েছে— ইতিহাসে প্রথমবার এত বড় পরিসরে। আর সেই সম্প্রসারণের হাত ধরেই ফিফা এবার মোট ৮৭১ মিলিয়ন ডলার বিলি করছে বিশ্বজুড়ে ফুটবল ফেডারেশনগুলোর মধ্যে, যা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে বিলি হওয়া অর্থের প্রায় দ্বিগুণ।

পুরস্কারের কাঠামো:

অবস্থানপুরস্কার
🏆 চ্যাম্পিয়ন৫০ মিলিয়ন ডলার
🥈 রানার্স-আপ৩৩ মিলিয়ন ডলার
🥉 তৃতীয়২৯ মিলিয়ন ডলার
৪র্থ২৭ মিলিয়ন ডলার
কোয়ার্টার ফাইনাল১৯ মিলিয়ন ডলার
শেষ ১৬১৫ মিলিয়ন ডলার
শেষ ৩২১১ মিলিয়ন ডলার
গ্রুপ পর্ব৯ মিলিয়ন ডলার

চার বছরে বাড়ল ৮ মিলিয়ন ডলার

সংখ্যাটা আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে যদি অতীতের দিকে ফিরে তাকানো যায়। ২০২২ সালে কাতারে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪২ মিলিয়ন ডলার। তার আগে ২০১৮-তে ফ্রান্স পেয়েছিল ৩৮ মিলিয়ন, ২০১৪-তে জার্মানি ৩৫ মিলিয়ন, আর ২০১০-এ স্পেন নিজেই জিতেছিল ৩০ মিলিয়ন ডলার নিয়ে। অর্থাৎ গত চারটি আসরের হিসাব ধরলে প্রতিবারই পুরস্কারের অঙ্ক বেড়েছে, আর ২০২২ থেকে ২০২৬-এ এসে এক লাফে বেড়েছে ৮ মিলিয়ন ডলার— যা একক আসরে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।

বিশ্বকাপের আর্থিক মূল্য গত দুই দশকে দ্রুত বেড়েছে।

বিশ্বকাপচ্যাম্পিয়ন প্রাইজ মানি
২০০৬ (জার্মানি)২০ মিলিয়ন ডলার
২০১০ (দক্ষিণ আফ্রিকা)৩০ মিলিয়ন ডলার
২০১৪ (ব্রাজিল)৩৫ মিলিয়ন ডলার
২০১৮ (রাশিয়া)৩৮ মিলিয়ন ডলার
২০২২ (কাতার)৪২ মিলিয়ন ডলার
২০২৬৫০ মিলিয়ন ডলার

মাত্র ২০ বছরে বিশ্বকাপজয়ীর পুরস্কার দুই-আড়াই গুণ বেড়েছে, যা বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক শক্তিরই প্রতিফলন।

মেসি-ইয়ামালের অ্যাকাউন্টে কি সরাসরি টাকা যায়?

অনেকেই ভাবেন, চ্যাম্পিয়ন হলে বুঝি সরাসরি খেলোয়াড়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে যায়। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। ফিফার পুরো পুরস্কারমূল্য প্রথমে জমা পড়ে সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল ফেডারেশনের কোষাগারে। এরপর প্রতিটি ফেডারেশন নিজস্ব নীতি অনুযায়ী ঠিক করে— খেলোয়াড়দের বোনাস কত হবে, কোচিং স্টাফ কতটা পাবে, আর বাকি অংশ যুব উন্নয়ন বা পরিকাঠামোয় কতটা বিনিয়োগ হবে। তাই লিওনেল মেসি বা লামিনে ইয়ামাল দল জেতালেও ঠিক কত টাকা তাঁদের হাতে আসবে, তা নির্ভর করে তাঁদের নিজ নিজ দেশের ফুটবল সংস্থার সিদ্ধান্তের ওপর, ফিফার ওপর নয়।

এত টাকা আসে কোথা থেকে?

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক— ফিফা এত বিপুল অর্থ পায় কীভাবে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে দর্শকসংখ্যায়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ টিভি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশ্বকাপ অনুসরণ করেন, আর এই বিপুল দর্শকই ফিফার আয়ের মূল চালিকাশক্তি। তিনটি প্রধান উৎস থেকে আসে এই অর্থ— সম্প্রচার স্বত্ব, বৈশ্বিক স্পনসরশিপ এবং হসপিটালিটি ও টিকিট বিক্রি। টিভি সম্প্রচার স্বত্বই বিলিয়ন ডলারের অঙ্কে ফিফার কোষাগার ভরিয়ে তোলে। আর যেহেতু বিশ্বকাপের দর্শকসংখ্যা আকাশছোঁয়া, তাই কোকা-কোলা, আডিডাস কিংবা নাইকির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নিজেদের লোগো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে মোটা অঙ্কের স্পনসরশিপ চুক্তি করে। এই সম্মিলিত আয়ই ফিফাকে সামর্থ্য দেয় প্রতিটি আসরে আগেরটির চেয়ে বড় পুরস্কার ঘোষণা করার।

আইপিএলের সঙ্গে এক নজরে তুলনা

ভারতীয় দর্শকদের কাছে অঙ্কটা আরও সহজবোধ্য হবে যদি দেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া বাণিজ্যিক ইভেন্ট আইপিএলের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ২০২৫ সালের আইপিএল চ্যাম্পিয়ন দল পেয়েছিল ২০ কোটি টাকা প্রাইজমানি। সেই হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নের প্রায় ৪৮০ কোটি টাকার পুরস্কার আইপিএল চ্যাম্পিয়নের প্রাপ্তির চেয়ে প্রায় ২৪ গুণ বেশি। তবে এই তুলনায় একটি পার্থক্য মাথায় রাখা জরুরি— আইপিএলে অর্থ যায় সরাসরি ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের হাতে, আর বিশ্বকাপে অর্থ যায় জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের কাছে, যার একটি বড় অংশ দেশের ফুটবল কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যয় হয়।

শেষ কথা

স্পেন হোক বা আর্জেন্টিনা— আগামীকাল যে দলই ট্রফি হাতে তুলুক না কেন, তারা শুধু সোনালি কাপ নয়, বয়ে নিয়ে যাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক পুরস্কারও। কিন্তু এই বিপুল অর্থের আসল তাৎপর্য মাঠের একক জয়ে সীমাবদ্ধ নয়। ফেডারেশনের হাত ঘুরে এই টাকার একটা বড় অংশ কাজে লাগে যুব একাডেমি গড়তে, নতুন প্রতিভা তৈরি করতে, দেশের ফুটবল পরিকাঠামো মজবুত করতে। তাই বিশ্বকাপের ফাইনাল আসলে শুধু নব্বই মিনিটের লড়াই নয়— এটা একইসঙ্গে বিশ্ব ক্রীড়া অর্থনীতির সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোর একটি, যেখানে একটা গোলের সঙ্গে বদলে যেতে পারে একটা গোটা দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ।

Leave A Reply

Exit mobile version