Thursday, August 20, 2026

সংক্ষিপ্তসার: সরকারি হাসপাতালে গুরুতর রোগীর চাপ সামলাতে বেসরকারি চিকিৎসা পরিকাঠামোকে আরও সক্রিয় ভাবে ব্যবহারের পথে এগোচ্ছে রাজ্য সরকার। বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি ভাবে পাঠানো সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য ২,৪২৬টি শয্যা নিশ্চিত করা হয়েছে। SSKM হাসপাতাল থেকে ইতিমধ্যেই তিন জন জরুরি রোগীকে KPC মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য, সরকারি হাসপাতালে শয্যা না থাকলেও যাতে গুরুতর রোগীর চিকিৎসা আটকে না যায়।

নিজস্ব সংবাদদাতা: কলকাতার বড় সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগীর চাপ দীর্ঘদিনের সমস্যা। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগী এলেও প্রত্যেকের জন্য সঙ্গে সঙ্গে শয্যা নিশ্চিত করা সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে জরুরি বিভাগেই অপেক্ষা করতে হয়। এই সমস্যার মোকাবিলায় রাজ্য সরকার সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোকে যুক্ত করার একটি নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করছে। এর ফলে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন এমন কোনও সংকটাপন্ন রোগীর জন্য শয্যা না থাকলে, স্বাস্থ্য দফতরের সমন্বয়ে তাঁকে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো যাবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় ইতিমধ্যে ২,৪২৬টি শয্যা চিহ্নিত করা হয়েছে।

সরকারি জমির শর্ত থেকে চিকিৎসা পরিষেবার নতুন ব্যবহার

এই ব্যবস্থার পিছনে রয়েছে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া সরকারি জমির ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত কিছু শর্ত কার্যকর করার পরিকল্পনা। নীতিটির মূল ভাবনা হল, যে সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সরকারি জমি বিনামূল্যে অথবা নামমাত্র মূল্যে পেয়েছে, তাদের পরিকাঠামোর একটি অংশ জনস্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা। অর্থাৎ, এত দিন যে পরিকাঠামো মূলত সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তার একটি নির্দিষ্ট অংশকে সরকারি হাসপাতালে আসা সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নীতিগত ভাবে এর ফলে নতুন হাসপাতাল তৈরি না করেই দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবার পরিসর বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।

২,৪২৬টি শয্যা কেন গুরুত্বপূর্ণ

একটি নতুন বড় হাসপাতাল তৈরি করতে জমি, ভবন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হয়। সেই প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে। তার পরিবর্তে ইতিমধ্যে চালু থাকা বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ব্যবহার করলে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে অতিরিক্ত চিকিৎসা পরিকাঠামো পাওয়া সম্ভব। ২,৪২৬টি শয্যা সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু শয্যার সংখ্যা ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন হাসপাতালে কখন শয্যা খালি রয়েছে, রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন কী, তাঁকে কত দ্রুত সেখানে পৌঁছনো সম্ভব এবং ভর্তি প্রক্রিয়া কতটা নির্বিঘ্ন হচ্ছে, তার উপরই এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে।

স্বাস্থ্য ভবনের নিয়ন্ত্রণকক্ষ হবে সমন্বয়ের কেন্দ্র

নতুন ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য ভবনের চব্বিশ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কোনও সরকারি হাসপাতালে গুরুতর রোগীর ভর্তি প্রয়োজন হলেও শয্যা না থাকলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল স্বাস্থ্য ভবনের নিয়ন্ত্রণকক্ষে খবর দেবে। এরপর কোন বেসরকারি হাসপাতালে উপযুক্ত শয্যা খালি রয়েছে, তা যাচাই করা হবে। শয্যা নিশ্চিত হওয়ার পর রোগীকে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সে করে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, রোগীর পরিবারকে নিজেরাই এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে শয্যা খুঁজে বেড়াতে হবে না। সরকারি ব্যবস্থার মধ্যেই রোগী স্থানান্তরের চেষ্টা করা হবে।

এসএসকেএমেই প্রথম পরীক্ষা

এই নতুন ব্যবস্থার প্রথম বাস্তব প্রয়োগ হয়েছে SSKM হাসপাতালে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসএসকেএম থেকে তিন জন জরুরি রোগীকে কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সেই সময় জরুরি বিভাগের শয্যাগুলিতে চাপ থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটি সংখ্যার বিচারে ছোট পদক্ষেপ হলেও ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা বোঝার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনও সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে শয্যার অভাব তৈরি হলে কয়েক জন রোগীকে দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া গেলেও নতুন রোগীর জন্য জায়গা তৈরি হতে পারে।

এসএসকেএমের উপর কতটা চাপ?

SSKM কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত সরকারি হাসপাতাল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দৈনিক প্রায় ৯০০ জন রোগী আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বহির্বিভাগেও প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার রোগীর উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। এই বিপুল রোগীর চাপের তুলনায় জরুরি বিভাগের শয্যা সীমিত। ফলে গুরুতর রোগীদের জন্য দ্রুত শয্যা নিশ্চিত করা একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ব্যবহার করা গেলে সরকারি হাসপাতালের জরুরি পরিষেবায় কিছুটা চাপ কমতে পারে।

পরবর্তী ধাপে আরও হাসপাতাল

SSKM থেকে শুরু হলেও এই ব্যবস্থা শুধু একটি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে রাখার পরিকল্পনা নেই। পরবর্তী পর্যায়ে কলকাতার আরও কয়েকটি বড় সরকারি হাসপাতালকে এর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ, কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ এবং সাগর দত্ত হাসপাতাল। ফলে একটি হাসপাতাল থেকে অন্য একটি নির্দিষ্ট হাসপাতালে রোগী পাঠানোর পরিবর্তে ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।

প্রশাসনিক ব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

এই ধরনের ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে সমন্বয়ের গতির উপর। ধরা যাক, কোনও সরকারি হাসপাতালে রাতের দিকে জরুরি রোগীর জন্য শয্যা পাওয়া গেল না। তখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুব দ্রুত প্রয়োজন হবে।

কোন বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা খালি আছে? সেই শয্যা কি ওই রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত? রোগীকে সেখানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কত দ্রুত করা যাবে? হাসপাতালে পৌঁছনোর পর ভর্তি নিয়ে কোনও জটিলতা তৈরি হবে কি না? এই প্রতিটি ধাপে দেরি হলে নতুন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

তাই শয্যার তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখা এবং সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন হাসপাতাল না বানিয়েও বাড়তে পারে চিকিৎসা ক্ষমতা

নীতিগত দিক থেকে এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নতুন পরিকাঠামো তৈরি না করেই বিদ্যমান পরিকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা। সরকারি হাসপাতালের রোগীর চাপ যখন হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন বেসরকারি হাসপাতালের নির্দিষ্ট শয্যাগুলি অতিরিক্ত সক্ষমতা হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, একটি হাসপাতালের উপর পুরো চাপ না রেখে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রোগীর চাপ ভাগ করে দেওয়া সম্ভব হবে।

তবে এর জন্য নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। বাস্তবে কতগুলি শয্যা ব্যবহার করা যাচ্ছে, কত জন রোগীকে পাঠানো হচ্ছে এবং রোগীদের চিকিৎসা পেতে কত সময় লাগছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে এলে ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হবে।

নীতির আসল পরীক্ষা কোথায়

২,৪২৬টি শয্যা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে বড় সংখ্যা। কিন্তু এই উদ্যোগের সাফল্য কেবল শয্যার সংখ্যায় বিচার করা যাবে না। আসল প্রশ্ন হল, সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়া কোনও সংকটাপন্ন রোগী কি সত্যিই দ্রুত অন্য হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছেন? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে এই ব্যবস্থা সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক কাঠামো হয়ে উঠতে পারে। অন্য দিকে, যদি শয্যার তথ্য সময়মতো পাওয়া না যায়, রোগী স্থানান্তরে দেরি হয় অথবা ভর্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে কাগজে থাকা শয্যার সংখ্যা বাস্তবে তেমন কাজে নাও আসতে পারে।

উপসংহার

সরকারি হাসপাতালের সীমিত শয্যার উপর ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে বেসরকারি চিকিৎসা পরিকাঠামোকে জনস্বার্থে ব্যবহার করার উদ্যোগটি রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২,৪২৬টি শয্যা নিশ্চিত করার পাশাপাশি SSKM থেকে প্রথম তিন জন রোগীকে KPC মেডিক্যাল কলেজে পাঠানোর মাধ্যমে পরিকল্পনাটি বাস্তব ক্ষেত্রেও পা রেখেছে।

এখন নজর থাকবে এই ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপের দিকে। আরও হাসপাতাল যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমন্বয় কতটা দ্রুত হয়, শয্যার তথ্য কতটা নির্ভুল থাকে এবং জরুরি রোগীরা কত দ্রুত বিনামূল্যে চিকিৎসা পান, সেটিই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

Leave A Reply

Exit mobile version