Friday, October 2, 2026

সংক্ষিপ্ত সার: নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে একসঙ্গে দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে। ১১ সদস্যের সম্প্রসারিত ব্রিকস যখন বিশ্বশাসনে আরও বড় ভূমিকার দাবি তুলছে, তখন অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও সামনে আসছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং Global South-এর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রশ্নে ঐকমত্য তৈরি হলেও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং সদস্যদের ভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থান ব্রিকসের সামনে বড় পরীক্ষা তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের ছবিতে নরেন্দ্র মোদী, শি জিনপিং এবং ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ আলাপ নতুন করে নজর কেড়েছে। ছবির মুহূর্তটি শুধু সৌজন্য বিনিময়ের দৃশ্য নয়, এর পিছনে রয়েছে বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর ভারত ও চিনের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, গত কয়েক বছরে তা কিছুটা কমানোর চেষ্টা হয়েছে। জিনপিংয়ের সাত বছর পর ভারত সফর সেই প্রক্রিয়াকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

তবে ব্রিকসের বর্তমান বাস্তবতা শুধু ভারত চিন সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। Brazil, Russia, India, China এবং South Africa দিয়ে শুরু হওয়া এই গোষ্ঠী এখন ১১ সদস্যের। Egypt, Ethiopia, Indonesia, Iran এবং UAE যুক্ত হওয়ার ফলে এর অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। ভারতীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১১টি দেশ মিলিয়ে বিশ্বের প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ জনসংখ্যা, প্রায় ৪০ শতাংশ GDP এবং ২৬ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।

বড় শক্তি, কিন্তু এক সুরে কথা বলা কি সম্ভব?

ব্রিকসের বিস্তার গোষ্ঠীটিকে আরও শক্তিশালী করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতাও বাড়িয়েছে। সদস্য দেশগুলির কূটনৈতিক অগ্রাধিকার এক নয়। রাশিয়া ও চিন ব্রিকসকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাবের ভারসাম্য তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখতে আগ্রহী। অন্যদিকে ভারত ব্রিকসের মধ্যে কাজ করার পাশাপাশি United States এবং Europe-এর সঙ্গেও নিজের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। এই বৈচিত্র্যই ব্রিকসের শক্তি এবং দুর্বলতা দুটোই। একদিকে এতগুলি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিকে এক জায়গায় আনা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রশ্নে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

২০২৬ সালের মে মাসে ব্রিকসের বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ভারত Chair’s Statement এবং Outcome Document প্রকাশ করে। নথিতে সদস্যদের মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন মতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

অর্থনৈতিক সহযোগিতাই কি ঐক্যের মূল ভিত্তি?

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ব্রিকস দেশগুলির আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, cross border payment ব্যবস্থা আরও সহজ করা এবং সদস্য দেশগুলির payment systems-এর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এবারের ব্রিকস আলোচনায় কোনও অভিন্ন BRICS currency চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং দ্রুত ও কম খরচে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ব্যবস্থা তৈরির দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। BRICS Payment Task Force সদস্য দেশগুলির payment এবং messaging systems-এর মধ্যে আরও কার্যকর যোগাযোগ তৈরির বিষয়ে কাজ করছে। ভারতও BRICS দেশগুলির payment systems যুক্ত করার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে। এর পাশাপাশি central bank digital currencies বা CBDC-এর মধ্যে সংযোগ তৈরির প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। তবে প্রযুক্তিগত জটিলতা, সদস্য দেশগুলির রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিশেষ করে ভারত চিন আর্থিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতা এই উদ্যোগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

মোদী জিনপিং বৈঠক কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ব্রিকস সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ভারত চিন সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিবর্তন। ২০২০ সালের Galwan সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। সীমান্তে সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা চললেও আস্থার ঘাটতি পুরোপুরি দূর হয়নি। এই পরিস্থিতিতে জিনপিংয়ের সাত বছর পর ভারত সফর এবং মোদীর সঙ্গে বৈঠককে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। চিনের তরফে দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখার বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতও সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে সম্পর্ক উন্নতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ মোদী জিনপিংয়ের এই যোগাযোগকে সরাসরি নতুন বন্ধুত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সীমান্ত বিরোধ বজায় রেখেও কীভাবে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Global South-এর জন্য নতুন ভূমিকার দাবি

ব্রিকসের সম্প্রসারণের পিছনে অন্যতম বড় যুক্তি হল Global South-এর দেশগুলির জন্য আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি জায়গা তৈরি করা। ভারত দীর্ঘদিন ধরে United Nations Security Council এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। ব্রিকসের সাম্প্রতিক আলোচনাতেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। UN Security Council-এ উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি সেই বৃহত্তর ভাবনার অংশ। প্রধানমন্ত্রী মোদীও ব্রিকস মঞ্চে Global South-এর প্রতিনিধিত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্নটি সামনে এনেছেন। একই সঙ্গে তিনি সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বিপদে পড়া নাবিকদের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক Emergency Support Network তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন।

AI নিয়েও বাড়ছে ব্রিকসের গুরুত্ব

ব্রিকসের আলোচনা এখন আর শুধু বাণিজ্য বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। Artificial Intelligence-এর মতো নতুন প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক governance নিয়েও সদস্য দেশগুলি অবস্থান তৈরি করছে। সাম্প্রতিক BRICS নথিতে AI-এর নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়নমুখী ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। Global South-এর দেশগুলির যাতে AI প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণেও ভূমিকা থাকে, সেই ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। ভারতের সভাপতিত্বে digital public infrastructure, AI, innovation, health এবং industrial cooperation-এর মতো বিষয়ও ব্রিকসের agenda-তে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে গোষ্ঠীটি ধীরে ধীরে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ থেকে প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক governance-এর আলোচনার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে।

পশ্চিমা বিশ্বের বিকল্প, নাকি সহযোগিতার আরেক মঞ্চ?

ব্রিকসকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই। রাশিয়া ও চিনসহ কয়েকটি সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাব কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলছে। অন্যদিকে ভারত প্রকাশ্যেই ব্রিকসকে কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জোট হিসেবে দেখাতে চাইছে না। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকস যদি একেবারে anti West রাজনৈতিক জোটে পরিণত হয়, তাহলে সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতপার্থক্য আরও বাড়তে পারে। কিন্তু যদি এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সংস্কারের একটি সহযোগিতামূলক মঞ্চ হিসেবে এগোয়, তাহলে বিভিন্ন মতের দেশগুলির একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ অনেক বেশি থাকবে। ২০২৬ সালের New Delhi Declaration-এ সদস্যরা পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সর্বোচ্চ সংযম, আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে UN Security Council অনুমোদনহীন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

ব্রিকসের সামনে এখন মূল প্রশ্ন সদস্য সংখ্যা কত বাড়ল তা নয়, বরং এত বৈচিত্র্যের মধ্যে কতটা কার্যকর সহযোগিতা তৈরি করা সম্ভব। Iran এবং UAE-এর মতো আঞ্চলিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে থাকা দেশ একই মঞ্চে রয়েছে। India এবং China-এর মধ্যেও সীমান্ত ও কৌশলগত মতপার্থক্য রয়েছে। Egypt এবং Ethiopia-র মধ্যেও আঞ্চলিক বিরোধ রয়েছে। তবু এই মতপার্থক্যের মধ্যেই ব্রিকসের রাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। কারণ সদস্য দেশগুলি শুধু নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করছে না, তারা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং বিশ্বশাসনের কাঠামো নিয়েও মত প্রকাশ করছে।

নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলন তাই কোনও একক দেশের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার গল্প নয়। এটি বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সন্ধান, যেখানে উদীয়মান অর্থনীতিগুলি নিজেদের স্বার্থ এবং Global South-এর বৃহত্তর দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে। মোদী জিনপিং পুতিনের একসঙ্গে উপস্থিতি সেই পরিবর্তনশীল কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতীকী ছবি হতে পারে। কিন্তু ছবি যতই আকর্ষণীয় হোক, ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে বাস্তব সিদ্ধান্তে। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য কতটা বাড়ে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি কতটা এগোয়, সদস্যদের মতপার্থক্য কীভাবে সামলানো যায় এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা কতটা বাস্তব ফল দেয়, তার উপরই নির্ভর করবে ব্রিকস আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির কতটা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠবে।

Leave A Reply

Exit mobile version