সংক্ষিপ্ত সার: নয়াদিল্লিতে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হল নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র ২০২৬। এই ঘোষণাপত্রে যুদ্ধ এবং একতরফা শুল্কনীতির বিরোধিতার পাশাপাশি জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রস্তাব দিয়েছেন নাবিকদের জন্য নতুন এক জরুরি সহায়তা ব্যবস্থারও। সম্মেলনের শেষে আগামী বছরের জন্য জোটের সভাপতিত্বের ভার তুলে দেওয়া হয়েছে চিনের হাতে।
বিশ্বজিৎ দাস: শনিবার নয়াদিল্লিতে শেষ হল অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সারারাত ধরে চলা আলোচনার পরে শনিবার ভোর চারটে নাগাদ চূড়ান্ত হয় যৌথ ঘোষণাপত্রের খসড়া, যা পরে সম্মেলনে সদস্য দেশগুলি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই ঘোষণা করেন, “কোনও সদস্য দেশ আপত্তি জানায়নি। নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র ২০২৬ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।”
ঘোষণাপত্রে কী কী আছে
ঘোষণাপত্রে সরাসরি কোনও দেশের নাম না করেই একতরফা যুদ্ধের নিন্দা করা হয়েছে, এবং কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ মেটানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংঘাতের মূল কারণ চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের চেষ্টার কথাও বলা হয়েছে ঘোষণাপত্রে। পাশাপাশি একতরফা শুল্ক এবং অন্যান্য বাণিজ্য বাধা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার আরও বাড়ানোর পক্ষেও সহমত হয়েছে সদস্য দেশগুলি। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ঘোষণাপত্রে।
জাতিসংঘ সংস্কারের ডাক
মোদী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেছেন, বদলে যাওয়া বিশ্বকে পুরনো কাঠামোয় থাকা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, প্রতিনিধিত্ব, তৎপরতা এবং নিয়ম তৈরির প্রক্রিয়া, এই তিন ক্ষেত্রেই সংস্কার প্রয়োজন। ঘোষণাপত্রেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত পুনর্গঠনের ডাক দেওয়া হয়েছে, যাতে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চিন এবং রাশিয়া দুই দেশই ভারত এবং ব্রাজিলের বৃহত্তর ভূমিকার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি তৈরি এবং তার নিয়ন্ত্রণবিধি রচনার ক্ষেত্রে গ্লোবাল সাউথের অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলির সমান অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন মোদী।
নাবিকদের জন্য নতুন প্রস্তাব
সম্মেলনে মোদী প্রস্তাব দিয়েছেন সিফেয়ারার্স ইমার্জেন্সি সাপোর্ট নেটওয়ার্ক তৈরির, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ এবং কূটনৈতিক মিশনগুলিকে একসূত্রে বেঁধে সঙ্কট সংকেত পাঠানো, চিকিৎসা সহায়তা, উদ্ধার প্রক্রিয়া এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ আরও দ্রুত করার চেষ্টা হবে। পশ্চিম এশিয়ায় চলা সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং তাতে কর্মরত নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই এই প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে।
চিনের প্রতিক্রিয়া এবং আগামী বছরের সভাপতিত্ব
সম্মেলনে উপস্থিত চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলিকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ব্রিকসকে তিনি গ্লোবাল সাউথের নেতৃস্থানীয় শক্তি এবং স্বনির্ভরতার একটা মডেল বলে বর্ণনা করেছেন। ২০২৭ সালে জোটের আবর্তনশীল সভাপতিত্বের দায়িত্ব যাচ্ছে চিনের হাতে। চিনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছর বহুপাক্ষিকতা, উন্নয়নের কৌশলগত সমন্বয় এবং গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ সহ একাধিক উদ্যোগে জোর দেবে বেজিং।
কারা ছিলেন সম্মেলনে
সম্মেলনে হাজির ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মতো একাধিক রাষ্ট্রনেতা।
উপসংহার
রাতভর আলোচনার পরে সর্বসম্মত ঘোষণাপত্র প্রকাশ নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে, বিশেষত পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং বাণিজ্য নীতি নিয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও। মোদী নিজেই বলেছেন, ঘোষণাপত্র শুধু কাগজে থেকে গেলে চলবে না, তার প্রতিটা প্রতিশ্রুতি বাস্তবের মাটিতে রূপ পেতে হবে। জাতিসংঘ সংস্কার থেকে নাবিকদের নিরাপত্তা, প্রতিটা প্রস্তাব সত্যিই কার্যকর হয় কিনা, তা নির্ভর করবে আগামী বছর চিনের সভাপতিত্বে জোট কীভাবে এগোয়, তার উপরেই।
