কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে ঘিরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক প্রতীক, আর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর সঙ্গে যুক্ত এই প্রতীক কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়চিহ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন, ভারতীয় শিল্পের ঐতিহ্য এবং যাদবপুরের দীর্ঘ বৌদ্ধিক ইতিহাস। সংঘর্ষের মধ্যে প্রতীকের ক্ষতি তাই রাজনৈতিক অশান্তির একটি দৃশ্যমান চিহ্ন হয়ে ওঠার পাশাপাশি সামনে এনেছে আরও গভীর একটি প্রশ্ন, রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কতটা নিরাপদ? এই ঘটনার পর শিল্পী, শিক্ষক, ছাত্র এবং প্রাক্তনীদের প্রতিক্রিয়ায় সেই উদ্বেগই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ঐতিহাসিক প্রতীকের ক্ষতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে থাকা ঐতিহাসিক প্রতীকটি সাম্প্রতিক ক্যাম্পাস সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা একটি সাধারণ সম্পত্তি নষ্টের ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই প্রতীকটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় বহনকারী একটি চিহ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, জাতীয়তাবাদী শিক্ষাচিন্তা এবং ভারতীয় আধুনিক শিল্পের উত্তরাধিকার। প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রতীকের নকশার সঙ্গে শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নাম যুক্ত, যিনি বঙ্গীয় শিল্পধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় আধুনিক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। চল্লিশের দশকে এই প্রতীক নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রতীকটির মূল্য কেবল তার ধাতব কাঠামো বা দৃশ্যমান নকশায় সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের ভাবনা এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নির্মাণের যে বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা থেকে যাদবপুরের শিক্ষাচিন্তার বিকাশ, সেই উত্তরাধিকারেরও একটি দৃশ্যমান প্রকাশ এই প্রতীক। ফলে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে এর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিয়ে শিল্পী, শিক্ষক, প্রাক্তনী এবং বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের একাংশের উদ্বেগের কারণটি সহজেই বোঝা যায়।
প্রতীকের নকশায় যে শিক্ষাদর্শ
প্রতীকটির নকশার মধ্যেও রয়েছে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাদর্শ। তিনটি শিখাকে বৌদ্ধিক প্রশিক্ষণ, আবেগ ও কল্পনার বিকাশ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে পদ্মের পাপড়ির সঙ্গে দর্শন, চারুকলা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতীকটি কোনও একমাত্রিক প্রযুক্তিগত শিক্ষার ধারণাকে প্রকাশ করে না, বরং মানুষের সামগ্রিক বিকাশের একটি বৃহত্তর দর্শনকে সামনে আনে। এই কারণেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীককে একটি প্রতিষ্ঠানগত চিহ্নের পাশাপাশি তার বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবেও দেখা যায়। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রাজেশ্বর সিনহার বক্তব্যেও এই অনুভূতির প্রতিফলন রয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক গোটা ছাত্র, শিক্ষক এবং প্রাক্তনী সমাজের কাছে একটি পবিত্র প্রতীক এবং সেটিকে পদদলিত করা শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রতি অপরাধ নয়, জাতীয় অনুভূতি ও ইতিহাসের প্রতিও অসম্মান। এই বক্তব্যের তাৎপর্য আরও বেড়ে যায় যখন আমরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের মুক্তচিন্তা, বিতর্ক এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের ঐতিহ্যের কথা বিবেচনা করি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক তখন কেবল একটি লোগো থাকে না, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া একটি সম্মিলিত স্মৃতির বাহক হয়ে ওঠে।
প্রতীক কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল, তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে প্রতীকটির ক্ষতি কীভাবে হয়েছিল, তা নিয়েই অবশ্য রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, ৪ নম্বর গেট বেয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় এবিভিপি সমর্থকদের একাংশের কারণে প্রতীকের বাইরের ধাতব পদ্মের অংশ ভেঙে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ধাতব অংশটি পদদলিত করা হয়েছিল এবং পরে সেটি ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা ছাত্র ও শিক্ষকদের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে এবিভিপি এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, প্রতীকটি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা হয়েছে এবং এর পিছনে অতি বাম ও নকশালপন্থী শক্তির ষড়যন্ত্র রয়েছে। ফলে দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ প্রমাণের উপর নির্ভর করা জরুরি। একই সময়ে ক্যাম্পাসে পতাকা ও পোস্টার ছেঁড়া, দেওয়াল লিখন মুছে ফেলার চেষ্টা এবং সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগও সামনে এসেছে। এই ঘটনাগুলিকে কেউ কেউ বৃহত্তর মতাদর্শগত সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে এসব ঘটনার ক্ষেত্রেও কারা দায়ী, তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।
শিল্পী মহলে কেন তৈরি হয়েছে উদ্বেগ
এই ঘটনার অভিঘাত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক মহলেও পৌঁছেছে। গৌরাঙ্গ কুইলা, দেবজ্যোতি জানা, ভবতোষ সুতার, বিশ্বনাথ দে এবং সুধীর রঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী ও শিল্পশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নন্দলাল বসুর সঙ্গে যুক্ত সৃষ্টির ক্ষতিকে গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের বক্তব্যের মধ্যে একটি সাধারণ বার্তা স্পষ্ট, রাজনৈতিক সংঘর্ষের কারণে কোনও ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম বা সাংস্কৃতিক সম্পদ ধ্বংস হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ভবতোষ সুতারের বক্তব্যের ভাবার্থ অনুযায়ী, শিল্পীরা কখনও ভাঙা অংশ থেকেও নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা খুঁজে নিতে পারেন, কিন্তু কোনও সৃষ্টিকে মুছে ফেলা বা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এই জায়গাতেই যাদবপুরের প্রতীককে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। একটি ঐতিহাসিক প্রতীককে যদি রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ঐতিহাসিক সম্পদ কতটা নিরাপদ থাকবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
ঐতিহ্য রক্ষার সঙ্গে যাদবপুরের পরিচয়ের সম্পর্ক
নন্দলাল বসুর মতো শিল্পীর কাজের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়, ভারতীয় শিল্প ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও তা যুক্ত। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের সঙ্গে মুক্তচিন্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশ, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক আলোচনার একটি দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। সেই পরিবেশে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু মতাদর্শের সংঘাত যখন শারীরিক আক্রমণ, ভাঙচুর অথবা ঐতিহাসিক প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত করার পর্যায়ে পৌঁছয়, তখন তার প্রভাব পুরো শিক্ষাঙ্গনের উপর পড়ে। তাই ঐতিহাসিক প্রতীক রক্ষা করা শুধু একটি ধাতব কাঠামো সংরক্ষণ নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্মৃতি ও পরিচয়কে সুরক্ষিত রাখার প্রশ্ন।
প্রতীক পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ সংরক্ষণের প্রয়োজন
এই পরিস্থিতিতে প্রতীকটির সংরক্ষণকে কেবল মেরামতের বিষয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ধাতব অংশটি উদ্ধার করে পুনরায় স্থাপন করার উদ্যোগ ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের একাংশের মধ্যে প্রতীকটির প্রতি গভীর আবেগ এবং দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে বলে প্রদত্ত তথ্যে উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন ঐতিহাসিক সম্পদের জন্য পৃথক সুরক্ষা ব্যবস্থা, নিয়মিত সংরক্ষণ এবং নথিভুক্তিকরণের মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্য তালিকা তৈরি করা হলে কোন সম্পদগুলি বিশেষ সুরক্ষার প্রয়োজন, তা স্পষ্ট হবে। তবে এই সংরক্ষণ উদ্যোগ যেন কোনও রাজনৈতিক পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতীকী ব্যবস্থা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্য সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ইতিহাসকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখা।
তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে প্রকৃত ঘটনা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা তাই একাধিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে এটি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মেরুকরণ, নিরাপত্তা এবং বহিরাগত প্রবেশের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, অন্যদিকে নন্দলাল বসুর সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে শিল্প ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টিকে সামনে এনেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্তের ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতীকটি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল, কারা সেই ঘটনায় যুক্ত ছিল, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তায় কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আটকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার উত্তর তদন্ত থেকেই পাওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, কোনও পক্ষের সংঘর্ষের মূল্য যাতে একটি ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম বা শিক্ষাঙ্গনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দিতে না হয়, সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
উপসংহার
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শুধু তার ভবন, পাঠক্রম বা নথিতে থাকে না। তার প্রতীক, শিল্পকর্ম, দেওয়াল লিখন, স্মৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের মধ্যেও সেই ইতিহাস বেঁচে থাকে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা তাই একটি নির্দিষ্ট দিনের সংঘর্ষের স্মৃতি হয়ে না থেকে শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বৃহত্তর আলোচনার কারণ হয়ে উঠেছে। সেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত একটি সহজ প্রশ্ন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই তীব্র হোক, আমরা কি আমাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে তার ঊর্ধ্বে রেখে রক্ষা করতে পারব? যাদবপুরের ক্ষেত্রে সেই উত্তর শুধু একটি প্রতীককে নয়, একটি প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি এবং স্বাধীন চিন্তার সংস্কৃতিকেও ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করবে।
