সংক্ষিপ্ত সারাংশ: প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিশ্বের সবচেয়ে সুসংহত এবং শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে পরিচিত আমেরিকা কানাডা সীমান্ত সম্পর্ক এখন এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে। উচ্চপর্যায়ের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র কানাডার প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী Mark Carney জানিয়েছেন, তার দেশ “ডলারের বিপরীতে ডলার” ভিত্তিতে সমমূল্যের পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে, যা কার্যকর হবে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে।
কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক: ৫ হাজার ৫২৫ মাইল দীর্ঘ আমেরিকা কানাডা সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের কাছে শান্তিপূর্ণ এবং অবাধ সহযোগিতার এক আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। প্রতিদিন প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ এবং প্রায় ২০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য এই সীমান্ত অতিক্রম করে, আর Detroit এবং Windsor র মতো শহরের অর্থনীতি কার্যত একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু শনিবার সকাল থেকে এই দীর্ঘদিনের সম্পর্কে দেখা দিয়েছে এক গভীর ফাটল, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সম্পূর্ণ নতুন এবং অনিশ্চিত এক বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কেন এই শুল্ক আরোপ
ওয়াশিংটনে চূড়ান্ত মুহূর্তে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ১৯৩০ সালের Tariff Act এর Section 338 প্রয়োগ করে এই ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে। এই আইনি ধারাটা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই একই আইন থেকেই জন্ম হয়েছিল কুখ্যাত Smoot Hawley শুল্কের, যাকে অর্থনীতিবিদরা এবং ইতিহাসবিদরা ১৯৩০ এর দশকের মহামন্দাকে আরও গভীর করার জন্য দায়ী করে থাকেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, Section 338 এমন একটা ক্ষমতা, যা প্রয়োগ করতে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের প্রয়োজন হয় না এবং এর কোনো সময়সীমাও নেই। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের আগের জরুরি শুল্ক আরোপের ক্ষমতাকে অতিরিক্ত এবং এক্তিয়ারবহির্ভূত বলে খারিজ করে দেওয়ার পর এই বিকল্প আইনি পথটাই বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কী কী পণ্যে শুল্ক
নতুন এই ৫০ শতাংশ শুল্ক কানাডার প্রায় ২০০০ কোটি ডলার মূল্যের রপ্তানি পণ্যকে প্রভাবিত করবে, যা কানাডার মোট বার্ষিক রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশ। এই তালিকায় রয়েছে ইলেকট্রনিক্স, শিল্প যন্ত্রপাতি এবং দুগ্ধজাত পণ্যের মতো বড় শিল্পক্ষেত্রের পাশাপাশি হকি স্টিক, ওয়াইন এবং এমনকি জিভ পরীক্ষার কাঠি অর্থাৎ tongue depressor র মতো অপেক্ষাকৃত ছোট অথচ প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যও। এই নতুন শুল্ক ইস্পাত, কাঠ এবং গাড়ি শিল্পের উপর আগে থেকেই থাকা শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যাকে কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্স উত্তর আমেরিকার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার উপর একটা বড় আঘাত বলে অভিহিত করেছে।

কানাডার পাল্টা পদক্ষেপ
কানাডার প্রধানমন্ত্রী Mark Carney স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তার দেশ এখন থেকে “আমেরিকা বদলে গেছে” এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছে এবং পুরনো সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার মতে, শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে যেসব নতুন শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এই শর্তগুলোর মধ্যে ছিল কানাডার গাড়ি শিল্পের জন্য শুল্ক ছাড় কমিয়ে দেওয়া, অন্য দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য চুক্তি করার ক্ষমতা সীমিত করা এবং কানাডার ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার দীর্ঘদিনের সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া।
কানাডা ৮ সেপ্টেম্বর থেকে “ডলারের বিপরীতে ডলার” ভিত্তিতে পাল্টা শুল্ক কার্যকর করবে, যার লক্ষ্য হবে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি যন্ত্রপাতি, কাগজ এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো ক্ষেত্র। এর আগে কানাডা ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং গাড়ি শিল্পের উপর নিজেদের অবশিষ্ট শুল্ক তুলে নেওয়ার এবং মার্কিন মদ বিক্রি পুনরায় চালু করার প্রস্তাব দিয়েছিল সমঝোতার আশায়, কিন্তু আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর সেই প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবি
আলোচনা ভেঙে যাওয়ার জন্য কে দায়ী, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি Jamieson Greer র দাবি, কানাডাই নতুন নতুন শর্ত যোগ করে এবং আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে আলোচনা ভেঙে দিয়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে ইস্পাত, গাড়ি এবং কাঠের উপর শুল্ক কমানোর মতো একটা “সর্বোত্তম প্রস্তাব” দিয়েছিল, যা কানাডা প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে Carney র বক্তব্য, ওয়াশিংটন অনেক বেশি দাবি করেছে অথচ বিনিময়ে দিয়েছে সামান্যই, এবং শেষ মুহূর্তের শর্তগুলো ছিল অন্যায্য এবং অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক, যা যেকোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়।
জনরোষ এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এই বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু অর্থনীতির খাতায় সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে কানাডার সাধারণ মানুষের মধ্যেও। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত Pete Hoekstra কে বহিষ্কারের দাবিতে একটা আবেদনপত্রে ইতিমধ্যে প্রায় ২ লক্ষ ৪৮ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের “৫১তম রাজ্য” বানানোর মতো উস্কানিমূলক মন্তব্যকে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করছেন। এদিকে কানাডার সবচেয়ে জনবহুল এবং শিল্পসমৃদ্ধ প্রদেশ Ontario র প্রিমিয়ার Doug Ford সরকারের পাল্টা শুল্ক নীতিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন, বলেছেন সব বিকল্পই এখন বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
USMCA চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
এই সংকট এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো তাদের ত্রিদেশীয় বাণিজ্য চুক্তি USMCA নবায়নের প্রক্রিয়ায় ছিল। মেক্সিকোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হলেও কানাডার সঙ্গে তা এখনও শুরুই হয়নি, আর বর্তমান সংকট সেই আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনাকেই এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। বর্তমানে কানাডার বেশিরভাগ পণ্য USMCA র শর্ত মেনে চলার কারণে ১০ শতাংশ ভিত্তিরেখার শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেয়ে থাকে, কিন্তু নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যত সেই কাঠামোকেই পাশ কাটিয়ে গেছে।
উপসংহার
আমেরিকা এবং কানাডার এই বাণিজ্য সংঘাত শুধু ২০০০ কোটি ডলারের পণ্যের বিষয় নয়, বরং এর পেছনে জড়িয়ে আছে গত বছর দুই দেশের মধ্যে ৮৮ হাজার কোটি ডলারের সামগ্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং USMCA চুক্তির ভবিষ্যৎ। দুই পক্ষই প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় বিশেষজ্ঞদের মতে এখান থেকে সমঝোতার পথ খুঁজে বের করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। ৮ সেপ্টেম্বর কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গোটা বিশ্ব অপেক্ষায় আছে, উত্তর আমেরিকার এই দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব শেষ পর্যন্ত এই সংকট সামলে উঠতে পারবে কিনা, নাকি একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতায় এই “বিশেষ সম্পর্ক” সত্যিই একটা অতীতের অধ্যায় হয়ে থেকে যাবে।


