সংক্ষিপ্তসার: আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নেপালের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রাস্তা ও সেতু পুনর্গঠনে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। NHPC এবং SJVN-এর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
হিমালয়ের পাহাড়ি নদীগুলিকে ঘিরে নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। কিন্তু ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা সেই পরিকাঠামোর দুর্বল দিকগুলি সামনে এনে দিয়েছে। মুহূর্তের প্রবল জলস্রোত ও ধ্বংসাবশেষে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সেতু ও রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছনো এবং পুনর্গঠন শুরু করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নেপালের পুনর্গঠনে ভারতের প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতায় ধাক্কা
বন্যার জেরে নেপালের প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে গোটা নেপাল অন্ধকারে চলে গিয়েছে।
নেপালের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪,৩০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রায় ৩,৬০০ মেগাওয়াট তখনও সচল ছিল। দেশের সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ২,৬০০ মেগাওয়াট হওয়ায় তাৎক্ষণিক ভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কিন্তু সমস্যাটি অন্য জায়গায়। নেপালের অতিরিক্ত বিদ্যুতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ভারত। ফলে উৎপাদন ক্ষমতার এই ক্ষতি ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ রফতানি এবং তার সঙ্গে যুক্ত আয়ের উপর চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, এই বিপর্যয়কে শুধু বিদ্যুৎ ঘাটতির সমস্যা হিসেবে দেখলে ছবির একটা বড় অংশ বাদ পড়বে। এটি নেপালের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ রফতানি এবং ভারত নেপাল জ্বালানি সহযোগিতার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিতরে জমেছে পলি, সরেছে যন্ত্রাংশ
বন্যার জল নেমে গেলেই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা সম্ভব নয়। ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলিতে প্রথমে জানতে হবে কোথায় কতটা পলি ও কাদা জমেছে এবং কোন যন্ত্রাংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল Electricity Authority-র প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক Hitendra Dev Shakya জানিয়েছেন, বিস্তারিত সমীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা যাবে না। বিশেষ করে পলি জমার জায়গা এবং Turbine সরে যাওয়ার মতো বিষয়গুলি আগে পরীক্ষা করতে হবে। এই কারণেই পুনর্গঠন হবে ধাপে ধাপে। প্রথমে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন, তার পরে নিরাপত্তা পরীক্ষা, এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ভারী সরঞ্জাম নিয়ে গিয়ে মেরামতির কাজ।
Trishuli ও Devighat নিয়ে বিশেষ নজর
ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলির মধ্যে Trishuli এবং Devighat বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। Trishuli প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ মেগাওয়াট এবং Devighat-এর ১৪.১ মেগাওয়াট। দুই প্রকল্পই অতীতে ভারতীয় সহায়তায় নির্মিত হয়েছিল। বন্যায় এই দুই প্রকল্পের পাশাপাশি Trishuli নদী করিডরের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, Rasuwa ও Nuwakot অঞ্চলে একাধিক চালু এবং নির্মীয়মাণ প্রকল্পে ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি Transmission Infrastructure-ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফলে একটি কেন্দ্র মেরামত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে Transmission Network এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও ধাপে ধাপে ফিরিয়ে আনতে হবে।
কেন ভারতের NHPC ও SJVN গুরুত্বপূর্ণ
নেপালের জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ভারতের উপস্থিতি নতুন নয়। ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা NHPC এবং SJVN ইতিমধ্যেই নেপালের একাধিক বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
SJVN-এর সঙ্গে রয়েছে ৯০০ মেগাওয়াট Arun III এবং ৬৭৯ মেগাওয়াট Lower Arun প্রকল্প। NHPC যুক্ত রয়েছে West Seti এবং Seti River 6-এর মোট ১,২০০ মেগাওয়াটের প্রকল্প এবং ৪৮০ মেগাওয়াট Phukot Karnali প্রকল্পের সঙ্গে। এছাড়া ৯০০ মেগাওয়াট Upper Karnali প্রকল্পে GMR Group-এর অংশগ্রহণ রয়েছে। এই কারণে ভারতের প্রযুক্তিগত সহায়তা শুধু একটি জরুরি উদ্ধার প্রচেষ্টা নয়। নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে। NHPC-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক Raj Kumar Chaudhary-এর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংস্থাটির পুনরুদ্ধার কাজে সহায়তা করার সক্ষমতা রয়েছে।
রাস্তা ও সেতু না ফিরলে বিদ্যুৎকেন্দ্রও ফিরবে না
বন্যায় নেপালের সমস্যা শুধু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতরে আটকে নেই। একাধিক রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলিতে কর্মী, যন্ত্রপাতি এবং ভারী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।
Trishuli Bazaar ও Devighat এলাকায় বন্যায় বাড়িঘরের পাশাপাশি সেতুও ভেসে গিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে Trishuli করিডরে পরিকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতির কথা উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি মেরামত নয়, বরং সেখানে পৌঁছনোর রাস্তা তৈরি করা। অর্থাৎ, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে হলে আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তার পরে শুরু হবে মূল যান্ত্রিক পুনর্গঠন।
বন্যার মানবিক মূল্যও ভয়াবহ
জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাবের আড়ালে রয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত Associated Press-এর প্রতিবেদনে নেপালের বন্যায় মৃতের সংখ্যা অন্তত ১,২৫২ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৪,২০০-এর বেশি বলে জানানো হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সঙ্গে যুক্ত বহু কর্মীও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
Reuters-এর প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের Tunnel এবং অন্যান্য এলাকায় আটকে পড়া কর্মীদের উদ্ধারে নেপাল ও আন্তর্জাতিক দলগুলি কাজ করছে। তাই পুনর্গঠনের প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়। প্রথম দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা, নিখোঁজদের সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে যোগাযোগ ফিরিয়ে আনা।
সামনে আরও বড় প্রশ্ন, কী ভাবে তৈরি হবে নিরাপদ পরিকাঠামো?
এই বিপর্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে। হিমালয়ের মতো ভূপ্রকৃতিগত ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বড় বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের বিপর্যয় মোকাবিলার ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী করা হয়েছে? নদীর উৎস, হিমবাহ, পাহাড়ি ঢাল এবং জলাধার একটি দেশের সীমার মধ্যে আটকে থাকে না। একটি অঞ্চলের আকস্মিক পরিবর্তনের প্রভাব কয়েকশো কিলোমিটার দূরের এলাকাতেও পৌঁছতে পারে।
এই কারণেই ভারতীয় National Hydropower Association-এর সভাপতি Abhay Kumar Singh নেপাল, ভারত ও চিনকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর মতে, উজানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ভাটির অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য তিন দেশের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা নয়, সীমান্ত পেরিয়ে নদী ব্যবস্থাপনা ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে পারে।
ভারতের জন্যও কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পুনর্গঠন
নেপালের অতিরিক্ত জলবিদ্যুৎ ভারতের বাজারে প্রবেশ করছে এবং দুই দেশের বিদ্যুৎ বাণিজ্য ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে নেপালের উৎপাদন পরিকাঠামো যত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যও তত দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ পাবে। এখানে তাই দুই দেশের স্বার্থ এক জায়গায় এসে মিলছে। নেপালের প্রয়োজন প্রযুক্তি, পরিকাঠামো এবং দ্রুত পুনর্গঠন। ভারতের প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল প্রতিবেশী দেশের নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা।
পুনর্গঠনের সামনে চারটি বড় ধাপ
নেপালের জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে মোটামুটি চারটি স্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রথমত, উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা। নিখোঁজদের সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।
দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার। রাস্তা ও সেতু মেরামত করে দুর্গম প্রকল্প এলাকায় পৌঁছনোর ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত সমীক্ষা ও মেরামত। পলি জমা, যন্ত্রপাতির ক্ষতি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করে ধাপে ধাপে পুনরুদ্ধার করা।
চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা। আগাম সতর্কীকরণ, উজানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।
উপসংহার
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা দেখিয়ে দিয়েছে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করা আর সেই প্রকল্পকে দীর্ঘদিন নিরাপদ রাখা এক বিষয় নয়। হিমালয়ের মতো কঠিন ভূপ্রকৃতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তা, সেতু এবং Transmission Network একে অপরের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত। একটি জায়গায় বড় ধাক্কা এলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা ব্যবস্থায়। এই পরিস্থিতিতে ভারতের NHPC ও SJVN-এর প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব নেপালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে পুনর্গঠনের সাফল্য শুধু কত দ্রুত Turbine চালু হল, তার উপর নির্ভর করবে না। মানুষের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রকল্পের নকশা, আগাম সতর্কীকরণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, ভবিষ্যতের জলবিদ্যুৎ উন্নয়নকে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে চলবে না। হিমালয়ের পরিবর্তনশীল পরিবেশে পরিকাঠামোকে একই সঙ্গে শক্তিশালী, নিরাপদ এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


