সংক্ষিপ্ত সার: আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে যে চিকিৎসার খরচ ছয় লক্ষ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, সেই একই ক্যান্সার চিকিৎসা এখন চিনের সাংহাইয়ে করানো যাচ্ছে তার অর্ধেকেরও কম খরচে। CAR-T থেরাপি নামে পরিচিত এই চিকিৎসার জন্য পশ্চিমী দেশ থেকে ক্রমশ চিনমুখী হচ্ছেন রোগীরা।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নিউ জিল্যান্ডের বাসিন্দা মাইকেল ওয়াল্টার্সের বয়স মাত্র ২৫। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে প্রথম পূর্ণ সময়ের চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন সবে, ঠিক তখনই ধরা পড়ে হজকিন লিম্ফোমা নামে একধরনের ক্যান্সার। অকল্যান্ডে একের পর এক কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপি করিয়েও লাভ হয়নি। শেষমেশ চিকিৎসকরা তাঁকে জানান CAR-T থেরাপির কথা। কিন্তু এই চিকিৎসা করাতে গিয়ে ওয়াল্টার্সকে পাড়ি দিতে হয় হাজার হাজার মাইল দূরে, চিনের সাংহাইয়ে।
কী এই CAR-T থেরাপি
চিমেরিক অ্যান্টিজেন রিসেপ্টর টি সেল থেরাপি, সংক্ষেপে CAR-T, এমন একটা চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে রোগীর নিজের শরীর থেকে রোগ প্রতিরোধী কোষ বার করে নিয়ে গবেষণাগারে সেগুলিকে নতুন করে বদলে দেওয়া হয়। এরপর সেই বদলে দেওয়া কোষ আবার রোগীর শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সেগুলি ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। এই থেরাপির সূত্রপাত হয়েছিল আমেরিকাতেই, আশির দশক থেকে সেখানে এই নিয়ে গবেষণা চলছে। ২০১২ সালে পেনসিলভানিয়ার ছয় বছর বয়সী শিশু এমিলি হোয়াইটহেডের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসার প্রথম বড় সাফল্য দেখা যায়, তিনি হয়ে ওঠেন এই থেরাপি নিয়ে সেরে ওঠা প্রথম শিশু। বর্তমানে তিনি সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকস্তরে পড়াশোনা করছেন, যেখানে তাঁর চিকিৎসা হয়েছিল।

কেন খরচ বাঁচাতে চিনমুখী রোগীরা
আমেরিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, একাধিক দেশে খোঁজ নেওয়ার পরে ওয়াল্টার্স জানতে পারেন, মেলবোর্নের একটা হাসপাতালে এই চিকিৎসা করানো সম্ভব, তবে খরচ হতে পারে প্রায় ছয় লক্ষ ডলার পর্যন্ত, যা তাঁর পরিবারের কাছে ছিল একেবারেই নাগালের বাইরে। শেষমেশ সাংহাইয়ের সিনোইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি এই চিকিৎসা করান, খরচ হয় সেই অঙ্কের অর্ধেকেরও কম। ১৮ অগস্ট তিনি জানতে পারেন, তাঁর লিম্ফোমা সম্পূর্ণ নিরাময় হয়ে গিয়েছে।
আরেক রোগীর অভিজ্ঞতা
নিউ জিল্যান্ডেরই আরেক বাসিন্দা জশ ব্রংকহর্স্ট, পেশায় এক আর্থিক পরিষেবা সংস্থার প্রধান কর্তা, বয়স ৫৯। ডিসেম্বরে ক্যান্সার ধরা পড়ার পরে চার মাস ধরে কেমোথেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপি করানোর পরেও তাঁর টিউমার বাড়তেই থাকে। চিকিৎসকরা জানান, আরেকবার কেমোথেরাপি করালেও সাফল্যের সম্ভাবনা মাত্র পনেরো শতাংশ। এরপরেই তিনিও পাড়ি দেন চিনে। সাংহাইয়ের জিয়াহুই ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসা শুরুর দশ দিনের মাথায় শরীরে জমে থাকা বাড়তি তরল কমতে শুরু করে, এবং চিকিৎসকরা তাঁর শরীর থেকে ড্রেনেজ টিউব খুলে ফেলতে সক্ষম হন।
চিন কীভাবে এগিয়ে এল এই ক্ষেত্রে
২০২১ সালে চিনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রথম বিদেশি রোগীদের CAR-T থেরাপি দেওয়ার অনুমতি দেয়। সাংহাইয়ের সিনোইউনাইটেড হাসপাতাল ২০২৩ সাল থেকে এই চিকিৎসা শুরু করার পর থেকে এখনও পর্যন্ত বারোটি দেশের প্রায় তিন ডজন রোগীর চিকিৎসা করেছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রধান নির্বাহী কর্তা কাঠি শি। আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া থেকেও ক্রমশ অনুসন্ধান বাড়ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালটি। টেক্সাসের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টারের লিম্ফোমা ও মায়েলোমা বিভাগের এক চিকিৎসকের মতে, অন্য শিল্পক্ষেত্রে যেভাবে চিন উৎপাদনকে শিল্পায়িত করেছে, ঠিক সেভাবেই কোষ চিকিৎসাকেও তারা একই পথে নিয়ে গিয়েছে।
কেন চিনে এত দ্রুত এই চিকিৎসা সম্ভব
CAR-T থেরাপির একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিটা রোগীর জন্য আলাদা করে কোষ তৈরি করতে হয়। চিনে সাংহাইয়ের কাছেই বেশ কিছু গবেষণাগারে অল্প সময়ে এই বিশেষ কোষ তৈরি সম্ভব হয়, যা অন্য অনেক দেশে দীর্ঘ অপেক্ষার তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে রাখে চিনকে। আক্রমণাত্মক ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করা রোগীদের কাছে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার এই সুযোগ একটা বড় আকর্ষণ।
সতর্কতা এবং কিছু বিতর্কও আছে
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, CAR-T এখনও একটা সীমিত ব্যবহারের চিকিৎসা, কারণ এটি হাতে গোনা কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই কার্যকর। সাধারণত অন্য সব চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার পরেই এই থেরাপির কথা ভাবা হয়, কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে শরীরে প্রদাহের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও। বিশ্বের একাধিক দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা রক্তের ক্যান্সার যেমন লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা এবং মায়েলোমার ক্ষেত্রে এই থেরাপি অনুমোদন করেছে।
চিনের ক্লিনিকাল ট্রায়াল ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি ঘটনায় পরীক্ষামূলক ওষুধ নেওয়ার পরে ছয় বছরের এক শিশুর মৃত্যুর খবর সামনে এসেছিল। চিনের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় হাসপাতালগুলিকে ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় তদারকি তুলনায় কম, যেখানে আমেরিকার ব্যবস্থা একদিকে যেমন উদ্ভাবনে সাহায্য করেছে, তেমনই রোগীদের জন্য কিছু ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। তবে চিনের বেসরকারি আন্তর্জাতিক হাসপাতালগুলি সাধারণত ক্লিনিকাল ট্রায়াল থেকে দূরে থেকে শুধুমাত্র বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত থেরাপিই ব্যবহার করে থাকে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় আরও কিছু অগ্রগতি
এই একই সময়ে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরও কিছু অগ্রগতির খবর সামনে এসেছে। অগস্ট মাসে আমেরিকার সংস্থা মডার্না এবং তাদের অংশীদার মার্ক জানিয়েছে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মেলানোমা রোগীদের ক্ষেত্রে তাদের mRNA ভিত্তিক টিকা ক্যান্সার ফিরে আসা বা ছড়িয়ে পড়া রুখতে সফল হয়েছে। এছাড়া আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত মাসে অগ্ন্যাশয়ের টিউমারের জন্য একটি নতুন থেরাপি অনুমোদন করেছে, যা এই মারণ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটা বড় পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
উপসংহার
মাইকেল ওয়াল্টার্স নিজেই বলেছেন, দশ কিংবা পনেরো বছর আগে হলে তাঁর কাছে এই বিকল্প থাকতই না। ক্যান্সারের মতো কঠিন অসুখের চিকিৎসায় খরচ এবং অপেক্ষার সময়, দুইই কমিয়ে আনার এই প্রবণতা রোগীদের কাছে নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাও মাথায় রাখা জরুরি, এই চিকিৎসা এখনও সীমিত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এবং কোনও দেশে চিকিৎসা করানোর আগে সেখানকার নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং হাসপাতালের অভিজ্ঞতা যাচাই করে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।


