Friday, October 2, 2026

সংক্ষিপ্ত সার: কেন্দ্র সরকার নতুন সেমিকন ২.০ নীতির আওতায় ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের দ্বিতীয় বাণিজ্যিক সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। প্রায় ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এই রোডম্যাপে ভর্তুকি কমানো হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে বলে দাবি করছে সরকার। একই সঙ্গে চিপ তৈরির পরিকাঠামোর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে দেশীয় AI মিশনকেও।

প্রযুক্তি ডেস্ক: বহু বছর ধরে বিশ্বের কাছে ভারতের পরিচয় ছিল মূলত সফটওয়্যার এবং তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার এক বিশাল কর্মক্ষেত্র হিসেবে, যেখানে হার্ডওয়্যার তৈরি হত অন্য দেশে, আর তার ব্যবহার হত এখানে। সেই ছবিটা এখন বদলাতে শুরু করেছে। দেশের ৮০ তম স্বাধীনতা দিবসের আগে বিকশিত ভারত লক্ষ্যকে সামনে রেখে কেন্দ্র সরকার এখন সেমিকন্ডাক্টর তথা চিপ তৈরির ক্ষেত্রে নিজেকে শুধু ক্রেতা নয়, নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। জুলাই ২০২৬ এ ঘোষিত সেমিকন ২.০ নীতি এবং তার সঙ্গে যুক্ত IndiaAI মিশন, এই দুইয়ে মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন কৌশল, যাকে অনেকে বলছেন Pax Silica যুগের প্রস্তুতি।

ভর্তুকি কমলেও কেন বাড়ছে আস্থা

সাধারণত কোনও প্রকল্পে সরকারি ভর্তুকি কমলে সেটাকে পিছু হটা হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু সেমিকন ২.০ র ক্ষেত্রে ঠিক উলটো ব্যাখ্যা দিচ্ছে সরকার। প্রথম পর্যায় সেমিকন ১.০ তে চিপ ফ্যাবের জন্য মূলধনী খরচের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি সহায়তা মিলত। নতুন কাঠামোয় সিলিকন ওয়েফার ফ্যাবের জন্য সেই সহায়তা কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। কম্পাউন্ড সেমিকন্ডাক্টর, সেন্সর এবং ডিসপ্লে ফ্যাবের জন্য মিলবে ৩৫ শতাংশ সহায়তা, আর যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও অন্যান্য কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ। আবেদনকারী সংস্থার ক্ষেত্রে বার্ষিক আয়ের ন্যূনতম শর্তও রাখা হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা, যাতে শুধু ভর্তুকির খোঁজে না এসে সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারীরাই এগিয়ে আসেন। ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশনের প্রথম পর্বে নগদ প্রণোদনার পরিমাণ প্রকল্প খরচের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল, যা রাজ্য সরকারের বাড়তি সুবিধা যোগ হলে কার্যত ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশে পৌঁছে যেত। সেই তুলনায় সেমিকন ২.০ তে সরাসরি ভর্তুকির হার কম হলেও, রয়্যালটি ফিনান্সিং এবং সংস্থার শেয়ারে অংশীদারিত্ব নেওয়ার মতো নতুন আর্থিক পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে, যা অনেকটা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থার কাজের ধরনের কাছাকাছি। শিল্পমহলের একাংশের মতে, এটাই বোঝায় যে বিশ্ব বাজারে ভারত আর ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষার জায়গা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শুধু চিপ নয়, গোটা ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা

চিপ তৈরির প্রক্রিয়া একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তার জন্য দরকার হয় বিশেষ রাসায়নিক, গ্যাস, নিখুঁত যন্ত্রপাতি, এবং শেষে চিপকে সুরক্ষিত রাখার জন্য উন্নত প্যাকেজিং ব্যবস্থা, যাকে শিল্পের ভাষায় বলা হয় OSAT। সেমিকন ২.০ নীতিতে ছয়টি মূল স্তম্ভ এবং দশটি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে গোটা ভ্যালু চেইনকেই সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে, শুধু ফ্যাব তৈরির উপর জোর না দিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সাপ্লাই চেইনকে অনেক বেশি মজবুত করে তোলে, কারণ কোনও একটি অংশে সমস্যা হলে গোটা ব্যবস্থা যাতে ধাক্কা না খায়, তার জন্য প্রস্তুতি থাকছে শুরু থেকেই।

সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, AI পরিকাঠামো, চিপ ডিজাইন এবং দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভারতের পরিকল্পনার চিত্র। ছবির উৎস: দ্য কলকাতা হেরাল্ডের সম্পাদকীয় গ্রাফিক্স বিভাগ
২০৩১ এর লক্ষ্য: দ্বিতীয় ফ্যাব, কড়া শর্ত

গুজরাটের ধোলেরায় টাটা ইলেকট্রনিক্সের হাত ধরে দেশের প্রথম বড় বাণিজ্যিক চিপ ফ্যাব তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই এগিয়েছে। এবার লক্ষ্য দ্বিতীয় ফ্যাব, যা চালু হওয়ার কথা ২০৩১ সালের মধ্যে। তবে এই দ্বিতীয় প্রকল্পের শর্ত প্রথমটির তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। ন্যূনতম ২০ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ২১০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে আগ্রহী সংস্থাকে। প্রয়োজন হবে ১২ ইঞ্চি ওয়েফার প্রযুক্তির আধুনিক ফ্যাব এবং উৎপাদনযোগ্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রযুক্তি। কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, এবার সরকারের লক্ষ্য শুধু উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো নয়, বরং এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ যা সরাসরি দেশের কৌশলগত স্বনির্ভরতা বাড়াতে সাহায্য করবে। আগামী এক দশকে সেমিকন ২.০ র ছয়টি ক্ষেত্র মিলিয়ে মোট পাঁচ থেকে সাত লক্ষ কোটি টাকার বাড়তি বিনিয়োগ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এক লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার তৈরির লড়াই

হার্ডওয়্যার তৈরির পরিকাঠামো যতই ভাল হোক, তা চালানোর জন্য দরকার দক্ষ মানুষ। চিপস টু স্টার্টআপ বা C2S কর্মসূচির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে এক লক্ষ সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ার তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে দেশের ৩২০ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিপ ডিজাইনের জন্য প্রয়োজনীয় EDA সফটওয়্যার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত হিসেবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি মিলিতভাবে ২১১ টি চিপের ডিজাইন সম্পূর্ণ করে তা তৈরির জন্য পাঠিয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি ১২ ন্যানোমিটারের মতো উন্নত প্রযুক্তিতেও সফলভাবে তৈরি হয়েছে। এই অগ্রগতির ভিত্তিতেই আশা করা হচ্ছে, আগামী দশকে বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আসবে ভারত থেকেই।

সার্বভৌম AI গড়ার চেষ্টা

হার্ডওয়্যার যদি শরীর হয়, তাহলে AI হল তার মস্তিষ্ক। বিদেশি বড় সংস্থার তৈরি বন্ধ প্রযুক্তির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে, ভারতের নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতির উপযোগী AI মডেল তৈরির দিকে এগোচ্ছে IndiaAI মিশন, যার মোট বরাদ্দ প্রায় দশ হাজার তিনশো বাহাত্তর কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত হিসেবে এই মিশনের আওতায় দেশে বসানো হয়েছে চল্লিশ হাজারের বেশি GPU, যার মাধ্যমে গবেষকদের জন্য প্রায় তিরানব্বই লক্ষ আঠারো হাজার GPU ঘণ্টা ভর্তুকিযুক্ত কম্পিউটিং সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শুধু বড় বিদেশি মডেলের অনুকরণ না করে, ভারত নিজস্ব কুড়িটি ফাউন্ডেশন মডেল বেছে নিয়েছে, যার মধ্যে আটটি ছোট ভাষা মডেল বা Small Language Model বিশেষভাবে ভারতীয় ভাষার জন্য তৈরি। এই মডেলগুলির পিছনে তথ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে AI Kosh, যেখানে চোদ্দো হাজারের বেশি ডেটাসেট এবং তিনশো একত্রিশটি মডেল মজুত আছে। এর পাশাপাশি নিরাপদ এবং দায়িত্বশীল AI ব্যবহার নিশ্চিত করতে চলছে তেরোটি আলাদা প্রকল্প, যা ভুয়ো তথ্য এবং ডিপফেকের মতো সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করবে। এই সব উদ্যোগের ফল হিসেবেই স্ট্যানফোর্ডের গ্লোবাল AI ভাইব্র্যান্সি রিপোর্টে AI প্রতিযোগিতায় বিশ্বে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে ভারত।

বিশ্ব মঞ্চে নতুন অবস্থান

সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রে আমেরিকা, জাপান, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, জার্মানির মতো দেশের সঙ্গে একের পর এক সমঝোতা করেছে ভারত। সাম্প্রতিক ইন্ডিয়া AI ইমপ্যাক্ট সামিটে আমেরিকা সহ একাধিক দেশের সঙ্গে মিলে যে নতুন জোট আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছে, তাকে বলা হচ্ছে Pax Silica। এর লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে চিপ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা। এর পাশাপাশি দেশের ডেটা সেন্টার ক্ষমতাও দ্রুত বেড়েছে, ২০২০ সালের তিনশো পঁচাত্তর মেগাওয়াট থেকে বর্তমানে তা পৌঁছেছে প্রায় এক হাজার পাঁচশো পঁচাত্তর মেগাওয়াটে, যার সঙ্গে জুড়ে আছে প্রায় দুশো বিলিয়ন ডলারের হাইপারস্কেলার বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি।

উপসংহার

সব মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ভারতের সেমিকন্ডাক্টর এবং AI নীতি এখন শুধু কারখানা তৈরির গল্প নয়। এটা একটা বড় কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ, যেখানে চিপ ডিজাইন, উৎপাদন, দক্ষ জনশক্তি এবং সার্বভৌম AI, সবকিছুকে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। ভর্তুকি কমিয়ে কড়া শর্ত বসানো হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মাধ্যমে এমন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে, যারা সত্যিকারের প্রযুক্তি এবং প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসবেন। ২০৩১ সালের মধ্যে দ্বিতীয় চিপ ফ্যাব বাস্তবে রূপ পেলে তা শুধু একটা কারখানা নয়, বরং বিশ্বের প্রযুক্তি মানচিত্রে ভারতের অবস্থান আরও পোক্ত করার একটা বড় ধাপ হয়ে উঠবে।

Leave A Reply

Exit mobile version