বিশ্বজিৎ দাস: শুরু হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম জনগণনার কাজ। ২০১১ এর পর কেটেগেছে পনেরোটা বছর, আবার শুরু হয়েছে ভারতের জনগণনার কাজ, ২০২৭। তবে হিসেব অনুযায়ী ২০২১-এ এই জনগণনার শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সেই সময় কোভিড-১৯ মহামারি ও তার পরবর্তী কিছু রাজনৈতিক কারনে এই কাজকে স্থগিত রাখা হয়। গত এপ্রিল মাস থেকে সারা ভারত জুড়ে জনগণনা ২০২৭ এর কাজ শুরু হয়েছে। তবে এইবারে ভারতে হতে চলেছে প্রথম ডিজিটাল জনগণনার কাজ। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ জাতিগত গণনা অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মোট ১১৭১৮.২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করার পাশাপাশি এই কাজের জন্য শক্তিশালী প্রশিক্ষিত প্রশাসনিক কাঠামোও গঠন করা হয়েছে।
জনগণনা কী?
জনগণনা হল কোন একটি দেশের ভৌগলিক এলাকায় বসবাসকারী সকল মানুষের তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া। যেখানে সকল মানুষের সামাজিক, সাংকৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তথ্য থাকে। যার দ্বারা আমরা খুব সহজে একটি দেশের জনসংখ্যা, সেই দেশের সামাজিক, সাংকৃতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো ভারতেও এই প্রক্রিয়া বিভিন্ন সময় সংঘটিত হয়েছে। ভারতে আধুনিক জনগণনার কাজ শুরু হওয়ার আগে থেকেই শাসকেরা জনসংখ্যা, ভূমিগত, কৃষি ও রাজস্ব সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতেন। রীগবেদ, কৌটিল্যের অর্থশস্ত্র, আইনী -আকবরী-তে জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহের বিভিন্ন ব্যবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এগুলিকে আধুনিক অর্থে জনগণনা বলেনা। আধুনিক জনগণনার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ ভারতীয় সরকারের হাত ধরে। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে গভর্নর জেনারেল লর্ড মেওয় (Lord Mayo)-এর উদ্যোগে আঞ্চলিক ভিত্তিতে (Non-synchronous Census) বৃহৎ আকারে জনগণনা শুরু হয়। পরবর্তী কালে ১৮৮১ সালে Census Commissioner of India W. C. Plowden নেতৃত্বে প্রথম একই সময় (Synchronous Census) ভারতের বেশির ভাগ অংশে জনগণনা করা হয়। এরপর থেকে প্রতি দশ বছর অন্তর এই জনগণনার কাজ পরিচালিত হয়েছে। তবে স্বাধীনতার আগে ১৯৩১-এর জনগণনা বিশেষভাবে তাৎপর্য পূর্ণ। যেখানে জাতভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং প্রায় চার হাজার জাতির সন্ধান পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার জনগণনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে পরিণত করে। ১৯৪৮-এ Census Act পাশ হয় এবং ১৯৫১ সালে স্বাধীন ভারতে প্রথম জনগণনা হয়। পরবর্তী সময় থেকে প্রতি দশ বছর অন্তর এই জনগণনার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে। তবে ২০১১ সালে স্বাধীন ভারতে প্রথম জাতিভিত্তিক সামাজিক- অর্থনৈতিক জনগণনা (Socio-Economic Caste Census-2011 ) করা হয়। এখানে কেবলমাত্র তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যাই হোক আবার একটি জনগণনা যেখানে ভারতের ইতিহাসে প্রথম বার ডিজিটাল পদ্ধতিতে জনপরিসংখ্যানের কাজ শুরু হয়েছে এবং একই সঙ্গে তপশিলি জাতি ও উপজাতির পাশাপাশি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও গণনা করা হবে। ভারতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন Office of the Registrar General & Census Commissioner, India এই জনগণনা কাজ পরিচালিত করে।
কেন প্রয়োজন জনগণনার?
জনগণনা শুধু জনসংখ্যার পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনীতির মানচিত্র। এর মাধ্যমে দেশের মোট জনসংখ্যা, নারী-পুরুষের অনুপাত সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান প্রভৃতি সামাজিক পরিষেবার পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। বিভিন্ন রাজ্য, জেলা, অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সরকারি সম্পদ বণ্টনে সাহায্য করে জনগণনার তথ্য। এর মধ্য দিয়ে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তর, নগরায়ণের গতি, অভিবাসনের অভিমুখ বোঝা যায়। জনসংখ্যার তথ্য নির্বাচনী এলাকার পুনবিবেচনা, প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুননির্ধারণ ও বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। এছাড়াও সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা যায়। অর্থাৎ সামগ্রিক ভাবে একটি দেশের উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য জনগণনা অপরিহার্য উপাদান।
জনগণনা ২০২৭ কেন গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জনগণনা ভারতের ১৬তম জনগণনা ও স্বাধীনতার পর ৮ম জনগণনা। তবে স্বাধীনতার পর এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতি ভিত্তিক ও ডিজিটাল জনগণনা। ২০১১ সালের পর দীর্ঘ দিন জনগণনা না হওয়ায় ভারত সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ ও সম্পদ বণ্টনে যে সমস্যা হচ্ছিল তা এবার সমাধান করা সম্ভব যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাছাড়া এই জনগণনা যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জাতি ভিত্তিক করা হচ্ছে তার ফলে পিছিয়ে পড়া শ্রেনী গুলির আরও বেশি করে উন্নয়ন করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ২০২৭ জনগণনা নিয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হল লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস, পার্লামেন্টে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জি। ১৯৭২ সালের পর লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস করা হয়নি, তাই জনসংখ্যার বৃদ্ধি সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেলোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস করতে ও পার্লামেন্টে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ করতে চাইছে। যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া বিরোধীরা অভিযোগ করছে এই জনগণনার মধ্য দিয়ে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকে বাস্তবায়িত করা হচ্ছে। যা এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
উপসংহার
জনগণনা শুধু জনসংখ্যা গণনার প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়, এটি রাষ্ট্রের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে নতুন করে বোঝার উপাদান। তাই সেই তথ্যকে নিয়ে রাজনীতি না করা বাঞ্ছনীয়, বিশেষ করে জাতি ভিত্তিক ভোটব্যাংকের রাজনীতি। তাছাড়া এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত সকল তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। তাই ২০২৭ জনগণনার সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কত মানুষ কোন জাতির অ সফল ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের উপর নয় বরং সেই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে ও গোপনীয়তা রক্ষা করে দেশে সুশাসন ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচী বাস্তবাহিত করার মাধ্যমে।
