বিশ্বজিৎ দাস: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জলকে দীর্ঘদিন ধরে মূলত পরিবেশ ও উন্নয়নের বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু নদীর জল যখন একাধিক রাষ্ট্রের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটি আর শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ থাকে না। জল হয়ে ওঠে কূটনীতি, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ভারত পাকিস্তান সম্পর্ক এই বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে, সীমান্ত সংঘাত হয়েছে, কূটনৈতিক সম্পর্ক বহুবার তলানিতে ঠেকেছে। তবু ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর থেকেছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ করাচিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি সিন্ধু নদী ব্যবস্থার জল ব্যবহারের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করেছিল। জাতিসংঘের চুক্তি নিবন্ধনেও করাচিকে চুক্তি স্বাক্ষরের স্থান এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬০-কে স্বাক্ষরের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু ২০২৫ সালের পহেলগাঁও সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থার ভিত নড়ে যায়। ভারত চুক্তিটিকে ‘অ্যাবেয়ান্সে’ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর রাতলে ও কিশনগঙ্গার মতো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পুরনো বিরোধ নতুন আইনি ও কূটনৈতিক মাত্রা পায়। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট হেগের Permanent Court of Arbitration বা PCA জানায়, চুক্তি এখনও কার্যকর এবং ভারত তার অধীনে থাকা বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত নয়। ভারত অবশ্য এই সিদ্ধান্ত এবং আদালতের এখতিয়ার দুটিই প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু কে কতটা জল পাবে, তা নয়। প্রশ্ন হল, জলসম্পদ কি একটি রাষ্ট্রের কৌশলগত শক্তির অংশ হয়ে উঠতে পারে? আর আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের সংঘাত হলে তার সমাধান কোথায়?
সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তির ভিত্তি
সিন্ধু নদী অববাহিকার ছয়টি প্রধান নদীকে চুক্তি মূলত দুই ভাগে ভাগ করেছে। রবি, বেয়াস ও শতদ্রু পূর্বাঞ্চলীয় নদী হিসেবে ভারতের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী হিসেবে পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হয়। তবে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীর ক্ষেত্রে ভারতের কোনও ব্যবহার নেই, এমন ধারণা সঠিক নয়। চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্তের অধীনে ভারত এই নদীগুলির জল গৃহস্থালি ব্যবহার, কৃষিকাজ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রেখে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির অধিকার ভারতের রয়েছে।
সরলভাবে বললে, চুক্তির মূল কাঠামো ছিল নদীভিত্তিক বিভাজন। পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলির উপর ভারতের অধিকতর নিয়ন্ত্রণ এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলির উপর পাকিস্তানের অধিকতর ব্যবহারাধিকার নিশ্চিত করা হয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলির গড় বার্ষিক প্রবাহ পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলির তুলনায় অনেক বেশি। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলির গড় প্রবাহ প্রায় ৩৩ মিলিয়ন একর ফুট এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলির প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন একর ফুট।
এই কারণেই প্রচলিত আলোচনায় ৮০ শতাংশ বনাম ২০ শতাংশের হিসাবটি আসে। তবে এটিকে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ‘মোট জলের মালিকানা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। চুক্তির প্রকৃত কাঠামো নদীভিত্তিক অধিকার ও নির্দিষ্ট ব্যবহারের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
কেন পাকিস্তানের কাছে এই চুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ?
পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা সিন্ধু নদী অববাহিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশটির Indus Basin Irrigation System বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেচব্যবস্থা। FAO-র তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেচাধীন জমির প্রায় ৯৩ শতাংশ Indus River Irrigation System-এর আওতায় ছিল। আরও সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও একই ধরনের নির্ভরতার ছবি দেখা যায়। Reuters-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমির সেচ সিন্ধু অববাহিকার জলের উপর নির্ভরশীল।
অর্থাৎ সিন্ধুর জল পাকিস্তানের কাছে শুধুমাত্র কৃষির বিষয় নয়। কৃষি থেকে খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ এর সঙ্গে যুক্ত। পাকিস্তানের মোট অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্বও উল্লেখযোগ্য। তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি: পাকিস্তানের GDP-এর ২৩ শতাংশ সরাসরি সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তির কারণে তৈরি হয়, এমন দাবি সরাসরি করা ঠিক নয়। ২৩ শতাংশের মতো সংখ্যা মূলত পাকিস্তানের কৃষি খাতের GDP অবদান বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি নদী অববাহিকার উপর অর্থনীতির নির্ভরতা এবং একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে GDP-এর কত শতাংশ তৈরি হয়, এই দুটি এক বিষয় নয়।
শহর, কৃষি ও জলনিরাপত্তা
পাকিস্তানের জলনিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরতার কারণে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের গ্রামীণ এলাকায় গৃহস্থালি জলের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং দেশের সামগ্রিক গৃহস্থালি জলের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ জল থেকে আসে। কৃষিক্ষেত্রেও ভূগর্ভস্থ জলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ সিন্ধু নদী ব্যবস্থার গুরুত্ব শুধু নদীর সরাসরি প্রবাহে সীমাবদ্ধ নয়। নদী ও সেচব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ, কৃষি এবং বৃহত্তর জলব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত। এই কারণে সিন্ধু অববাহিকার জলে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব কৃষিক্ষেত্রের বাইরে গিয়েও পড়তে পারে।
পহেলগাঁওয়ের পর জল হয়ে উঠল কূটনীতির অংশ
২২ এপ্রিল ২০২৫ পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাধিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরই মধ্যে ভারত সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তিকে ‘অ্যাবেয়ান্সে’ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্ত ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতদিন ভারত পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই খারাপ হোক, জলবণ্টন ব্যবস্থা আলাদা একটি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছে।
২০১৬ সালের উরি হামলার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘রক্ত ও জল একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না’ মন্তব্যটি সেই সময় থেকেই জলসম্পর্কের সঙ্গে নিরাপত্তা প্রশ্নকে যুক্ত করার রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল। ২০২৫ সালের পহেলগাঁও হামলার পর সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট নীতিগত রূপ পায়।
ভারতের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসবাদ এবং স্বাভাবিক জলসম্পর্ককে আলাদা করে দেখার সময় শেষ হয়েছে। পাকিস্তানের দৃষ্টিতে আবার সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি একটি আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, যাকে রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে একতরফাভাবে স্থগিত করা যায় না। এখানেই শুরু হয় মূল দ্বন্দ্ব।
আইনি লড়াই: নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ না সালিশি আদালত?
সাম্প্রতিক বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি নিয়ে ভারত পাকিস্তানের মতপার্থক্য। চুক্তির Article IX অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের বিরোধের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণ প্রশ্ন Permanent Indus Commission-এর মাধ্যমে আলোচনার চেষ্টা করা হয়। প্রযুক্তিগত ধরনের ‘difference’ নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে পারে। আর নির্দিষ্ট ধরনের ‘dispute’ Court of Arbitration বা সালিশি আদালতে যেতে পারে। এখানেই কিশনগঙ্গা ও রাতলে প্রকল্পের বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাকিস্তান জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির নকশা নিয়ে Court of Arbitration-এর পথে এগোতে চেয়েছিল। ভারত একই বিষয়কে Neutral Expert-এর মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে ছিল।
বিশ্বব্যাংক ২০২২ সালে Michel Lino-কে Neutral Expert এবং Sean Murphy-কে Court of Arbitration-এর Chairman হিসেবে নিয়োগ করে। বিশ্বব্যাংক নিজেই স্বীকার করেছিল যে দুটি প্রক্রিয়া একই সময়ে চলায় বাস্তব ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দরকার। বলা ঠিক হবে না যে বিশ্বব্যাংক নিজের সিদ্ধান্তে একটি আদালত বানিয়ে দিয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা ছিল চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিয়োগ ও প্রক্রিয়াগত সহায়তা দেওয়া। Court of Arbitration-এর আইনি ভিত্তি রয়েছে চুক্তির Article IX এবং Annexure G-তে।
আদালতের গঠন নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
আপনার দেওয়া লেখায় বলা হয়েছে, আদালতে ভারত ও পাকিস্তানের দুজন করে সদস্য এবং বিশ্বব্যাংকের তিনজন সদস্য থাকবেন। এখানেও সামান্য সংশোধন প্রয়োজন। Indus Waters Treaty-এর Annexure G অনুযায়ী Court of Arbitration-এ মোট সাতজন সদস্য থাকেন। ভারত ও পাকিস্তান দুজন করে arbitrator নিয়োগ করে। বাকি তিনজন হলেন umpires, যাদের মধ্যে একজন Chairman, একজন উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন engineer এবং একজন international law-এ অভিজ্ঞ ব্যক্তি। অর্থাৎ এই তিনজনকে সরাসরি ‘বিশ্বব্যাংকের সদস্য’ বলা সঠিক নয়। বিশ্বব্যাংক নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালন করে।
৩১ আগস্ট ২০২৬: হেগের রায়
৩১ আগস্ট ২০২৬ Permanent Court of Arbitration একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয়। আদালত জানায়, সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি এখনও কার্যকর এবং ভারতের একতরফা ‘অ্যাবেয়ান্স’ ঘোষণা চুক্তির বাধ্যবাধকতা শেষ করে দেয় না।
আদালত একই সঙ্গে রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের নির্দিষ্ট নির্মাণ কার্যক্রম সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ২০২৭ সালের জুলাই নাগাদ প্রত্যাশিত বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পাকিস্তান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। ভারতের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, তারা এই সালিশি আদালতের এখতিয়ার স্বীকার করে না এবং আদালতকে ‘অবৈধভাবে গঠিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়া ভারতের উপর কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে না।
ভারতের আপত্তির কেন্দ্রে আসলে কী?
ভারতের আপত্তিকে শুধুমাত্র ‘আদালতের রায় মানছে না’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ভারতের মূল প্রশ্ন হল, একই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে যখন Neutral Expert-এর প্রক্রিয়া চলছে, তখন Court of Arbitration-এর সমান্তরাল কার্যক্রম কতটা বৈধ।
এই প্রশ্নের পেছনে ২০১৬ সালের পুরনো বিরোধের ইতিহাস রয়েছে। পাকিস্তান Court of Arbitration-এর পথ বেছে নিয়েছিল, ভারত Neutral Expert-এর পথ চেয়েছিল। বিশ্বব্যাংক শেষ পর্যন্ত দুই প্রক্রিয়াই এগিয়ে নিয়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের নিজের নথিতেও বলা হয়েছে, দুটি প্রক্রিয়া একই সঙ্গে চালানো নিয়ে তারা বাস্তব ও আইনি ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত ছিল।
অন্যদিকে Court of Arbitration নিজস্ব এখতিয়ার নিয়ে আগেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে এবং ২০২৬ সালের সিদ্ধান্তেও তার অবস্থান বজায় রেখেছে। PCA-র নথিতে ২০২৩ সালে আদালতের competence নিয়ে award এবং ২০২৫ সালে supplemental award-এর উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বিরোধটি এখন দুই স্তরে চলছে। একটি হল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বৈধতা, অন্যটি হল কোন প্রতিষ্ঠান সেই বিরোধের বিচার করার অধিকার রাখে।
জল যখন অ-সামরিক কৌশলগত শক্তি
সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তির বর্তমান সংকট থেকে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আসে। একটি রাষ্ট্র কি সামরিক শক্তি ব্যবহার না করেও জলসম্পদকে কৌশলগত চাপের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে? ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উজানের দেশ হিসেবে নদীর প্রবাহ ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর উপর ভারতের ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে। তবে এই সুবিধাকে সরাসরি ‘জল বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
ভারতের পক্ষে পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত পুরো জল রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি জল নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় অবকাঠামো, জলাধার ও সঞ্চয়ক্ষমতা দরকার। Reuters-ও ২০২৫ সালে সতর্ক করেছিল যে ভারতের হাতে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে সময় লাগবে। তবু কৌশলগত গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
জলপ্রবাহের সময়, জলাধারের ব্যবস্থাপনা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালনা নিয়ে অনিশ্চয়তাও ভাটির দেশের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। ফলে জলসম্পদ শুধু সরবরাহের বিষয় নয়, অনিশ্চয়তা এবং কৌশলগত চাপ তৈরির মাধ্যমও হতে পারে। এ কারণেই Indus Waters Treaty এখন দক্ষিণ এশিয়ার hydropolitics-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তবে ‘জলকে অস্ত্র’ বলা কতটা যুক্তিযুক্ত?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। একদিকে ভারতের সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দিয়েছে, জলসম্পদকে কূটনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব। অন্যদিকে নদীর প্রবাহের সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের জীবন জড়িত। ফলে জলকে সরাসরি যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সিন্ধু অববাহিকায় জলসংকট তৈরি হলে তার প্রভাব প্রথমে পড়তে পারে কৃষক, কৃষিশ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের উপর। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য শেষ পর্যন্ত সমাজের দুর্বল অংশকেই বহন করতে হতে পারে।
তাই ‘hydro diplomacy’ এবং ‘water weaponisation’-এর মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। প্রথমটি জলকে আলোচনার ও কৌশলগত সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখে। দ্বিতীয়টি জলকে সরাসরি শাস্তি দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা তৈরি করে। ভারত পাকিস্তান সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সীমারেখাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন তিনটি প্রশ্নের উপর অনেকটাই নির্ভর করছে। প্রথমত, ভারত কতদিন চুক্তিকে ‘অ্যাবেয়ান্সে’ রাখবে এবং ভবিষ্যতে কোনও নতুন জলব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করবে কি না। দ্বিতীয়ত, Neutral Expert-এর প্রক্রিয়া ২০২৭ সালে কী সিদ্ধান্ত দেয় এবং সেই সিদ্ধান্ত ভারত পাকিস্তান উভয়ের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়। তৃতীয়ত, Court of Arbitration-এর সিদ্ধান্ত এবং ভারতের প্রত্যাখ্যানের মধ্যে তৈরি হওয়া আইনি বিরোধ কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হবে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের ক্রমবর্ধমান জল ও বিদ্যুৎ চাহিদা। অর্থাৎ আগামী দিনের Indus dispute শুধু ১৯৬০ সালের চুক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে থাকবে না। এটি ২১ শতকের পরিবর্তিত পরিবেশ ও নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত হবে।
উপসংহার
সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্কের মধ্যে একটি আশ্চর্যজনক স্থিতিশীলতার উদাহরণ হয়ে ছিল। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেও নদীর জল নিয়ে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বজায় ছিল। কিন্তু পহেলগাঁও হামলার পর সেই পুরনো সমীকরণ বদলে গেছে। ভারতের কাছে সন্ত্রাসবাদ এখন জলসম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও বিষয় নয়। পাকিস্তানের কাছে আবার সিন্ধুর জল তার কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং অর্থনীতির সঙ্গে এতটাই গভীরভাবে যুক্ত যে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ তার জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
৩১ আগস্ট ২০২৬-এর হেগের সিদ্ধান্ত সেই দ্বন্দ্বকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। আদালত বলেছে চুক্তি কার্যকর, ভারত বলেছে আদালতেরই এখতিয়ার নেই। একদিকে আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত—দুইয়ের মধ্যে সংঘাত এখন প্রকাশ্য। তাই সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আসল প্রশ্ন শুধু ‘কার কত জল?’ নয়।
প্রশ্নটি আরও বড়: সন্ত্রাসবাদ, সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং জলনিরাপত্তার সংঘাতের মধ্যে একটি ছয় দশকের পুরনো নদীচুক্তি কি নতুন দক্ষিণ এশীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে? সিন্ধু নদীর জল সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ভারত পাকিস্তান সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
