Friday, October 2, 2026

মৌনমুখর ঘোষ, The Kolkata Herald: ১৯ আগস্ট শিলংয়ে খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (KSU)-এর আয়োজিত কালো পতাকা-মোটরসাইকেল মিছিলের পর যে হিংসার বিস্ফোরণ ঘটল, তাকে নিছক আইন-শৃঙ্খলার অবনতির ঘটনা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতর তাৎপর্য অধরা থেকে যাবে। পাথর ছোড়া, হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং যানবাহন ভাঙচুর নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ। কিন্তু শিলংয়ের বাঙালি সম্প্রদায়ের কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর দৃশ্যগুলির একটি উঠে এসেছে রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন (R&R) কলোনি থেকে, যেখানে স্বামী বিবেকানন্দের একটি স্মারক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আবক্ষ মূর্তি ভাঙচুর করে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এগুলি নিছক কিছু সরকারি বা জনসাধারণের সম্পত্তি ছিল না। এগুলি ছিল স্মৃতির অংশ।

বিবেকানন্দ ও নেতাজি দুজনেই বাঙালি ছিলেন, কিন্তু তাঁদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনওভাবেই কেবল বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা ভারতীয় জাতীয় কল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালি উদ্বাস্তুদের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত একটি বসতিতে তাঁদের স্মারক ভাঙচুরের ঘটনা তাই নিছক একটি হিংসাত্মক মিছিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে তার অন্তর্নিহিত প্রতীকী অর্থকে অস্বীকার করা হয়। যে সম্প্রদায়ের সম্মিলিত স্মৃতিতে বাস্তুচ্যুতি, অনিরাপত্তা এবং অতীতের জাতিগত সংঘাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের কাছে সাংস্কৃতিক প্রতীকের ধ্বংস কেবল ভাঙচুর নয়, তা কখনও কখনও একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও প্রতিভাত হতে পারে।

এই আশঙ্কাকে তাই শোনা প্রয়োজন। অবশ্যই, KSU-এর রাজনৈতিক দাবিগুলিকে এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আদিবাসী সুরক্ষা, সরকারি নিয়োগ, অভিবাসন, জমি এবং জনসংখ্যাগত নিরাপত্তা, এসবই বৈধ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। কিন্তু কোনও দাবির বৈধতা কখনও হিংসাকে বৈধতা দেয় না। যে আন্দোলন একটি সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি দাবি করে, সেই আন্দোলন অন্য একটি সম্প্রদায়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে অস্বীকার করতে পারে না।

আর এখানেই রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক পরিহাস। খাসি পাহাড় ও বাংলার সম্পর্ককে কেবল ‘আদিবাসী’ বনাম তথাকথিত ‘বহিরাগত’-এর সাম্প্রতিক সংঘাত হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এই সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠেছে শিক্ষা, বৌদ্ধিক আদান-প্রদান, প্রশাসন, ধর্ম এবং সংস্কৃতির দীর্ঘ সংযোগের মধ্য দিয়ে, যার শিকড় ঊনবিংশ শতকেরও আগে প্রসারিত। ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, ১৮১৯ সালেই খাসি শিক্ষার্থীরা শ্রীরামপুর কলেজে পড়াশোনা করতে আসছিলেন। অর্থাৎ আধুনিক উচ্চশিক্ষার সঙ্গে খাসি সমাজের সংযোগ তৈরির প্রাথমিক পর্বগুলির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল বাংলা। এই আদান-প্রদান অবশ্য একমুখী ছিল না। ‘মেঘালয়’ নামটিও দিয়েছিলেন বাঙালি ভূগোলবিদ শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, যিনি পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট ভূগোলবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এই সম্পর্ক আজও কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। মেঘালয় সরকার কলকাতার কসবা ও রাসেল স্ট্রিটে দুটি Meghalaya House পরিচালনা করে, যেখানে রাজ্য থেকে কলকাতায় আসা ছাত্রছাত্রী, রোগী, সরকারি আধিকারিক এবং অন্যান্য নাগরিকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ, যে শহরের সাংস্কৃতিক প্রতীক আজ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, সেই শহরের সঙ্গে মেঘালয়ের সম্পর্ক এখনও শিক্ষা, প্রশাসন এবং দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে অটুট। মেঘালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এখনও পরীক্ষার জন্য কলকাতায় আসে। মেঘালয়ের মানুষ এখনও কলকাতার Meghalaya House ব্যবহার করেন। ইতিহাস এখনও বেঁচে আছে, নিঃশব্দে, নিয়মিতভাবে, প্রায় অদৃশ্যভাবে। আর ঠিক সেই কারণেই বর্তমানের এই বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা এত বেশি বেদনাদায়ক।

বর্তমান হিংসাকে খাসি ও হাইনিয়েত্রেপ জাতীয়তাবাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যেও দেখতে হবে। এই রাজনৈতিক ঐতিহ্যের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে এসেছে। কিছু আদিবাসী জাতীয়তাবাদী সংগঠন স্বাধীনতা দিবস বয়কটের ডাক দিয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে কালো পতাকা ব্যবহার করেছে ভারতীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক সংযুক্তি সম্পর্কে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে। ‘Khasi by Blood, Indian by Force’, KSU-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত এই স্লোগান সেই রাজনৈতিক চেতনারই একটি দিককে সামনে আনে। অবশ্যই এই ধারণাকে প্রতিটি খাসি মানুষের ওপর আরোপ করা যায় না। বরং এটি এমন এক আদিবাসী জাতীয়তাবাদের প্রকাশ, যেখানে খাসি পরিচয়, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জনসংখ্যাগত নিরাপত্তাকে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে এক ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে দেখা হয়। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। আদিবাসী অধিকার বৈধ। কিন্তু ‘বহিরাগত’ শব্দটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে তখনই, যখন এটি আর একটি রাজনৈতিক পরিচয় বা নীতিগত প্রশ্নকে নির্দেশ করে না, বরং নির্ধারণ করতে শুরু করে, কে নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকারী এবং কে নয়।

শিলংয়ের হিংসার সময় অসমের নম্বরপ্লেটযুক্ত গাড়িগুলিকে লক্ষ্য করে হামলার যে অভিযোগ উঠেছে, তার গুরুত্ব এখানেই। আদিবাসী ও অনাদিবাসীর মধ্যে যে রাজনৈতিক পার্থক্য দিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল, তা অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ধীরে ধীরে পরিচয়ের একটি জাতিগত শ্রেণিবিন্যাসে পরিণত হতে পারে। আর ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে, এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস খুব দ্রুতই বর্জনের অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।

এই হিংসা মেঘালয়ের সীমানার মধ্যে আটকে থাকেনি।

অসমের নম্বরপ্লেটযুক্ত যানবাহনে হামলার পর অসমের ট্যাক্সি ও বাণিজ্যিক গাড়ির চালকদের একাংশ মেঘালয়মুখী যান চলাচল খানাপাড়া ও জোরাবাটে আটকে দেন। পরবর্তী ঘটনায় মেঘালয়ের নম্বরপ্লেটযুক্ত যানবাহনও জোরাবাটে আটকে দেওয়ার খবর সামনে আসে। বিপদ আরও গভীর, কারণ অসম ও মেঘালয়ের মধ্যে ইতিমধ্যেই দীর্ঘদিনের আন্তঃরাজ্য সীমানা-বিতর্ক রয়েছে।

যদি সেই বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে জাতিগত অনিরাপত্তা যুক্ত হয়ে যায়, তবে তার অভিঘাত মূল ঘটনার বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। বাণিজ্য, পর্যটন, পরিবহণ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল প্রতিশোধমূলক রাজনীতির কাছে অচলাবস্থার শিকার হয়ে পড়ে থাকতে হয়|

তাই, এটি আর কেবল আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন থাকে না। এটি হয়ে ওঠে মানব-নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। কারণ, উত্তর-পূর্ব ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে কেবল সীমান্ত, সশস্ত্র বাহিনী এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার ভাষায় বোঝা যায় না। জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হল—যে সমাজে বিভিন্ন সম্প্রদায় একই রাস্তা, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক পরিসর ভাগ করে নেয়, তাদের মধ্যে নাগরিক আস্থা অটুট রাখা। শিলংয়ের ঘটনাকে কেবল খাসি বনাম বাঙালি অথবা মেঘালয় বনাম অসম, এই সরল দ্বৈততার মধ্যে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা রয়েছে। এটি ভুল হবে।

KSU সমগ্র খাসি সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না। কোনও হিংসাত্মক প্রতিবাদকারী একটি সম্পূর্ণ সম্প্রদায়ের প্রতীক নন। একজন বাঙালি বাসিন্দা কেবল তাঁর বংশপরিচয়ের কারণে ‘বহিরাগত’ হয়ে যান না। এবং অসমের নম্বরপ্লেটযুক্ত একটি গাড়িও কোনও শত্রুপক্ষের প্রতীক নয়।

গভীরতর প্রশ্নটি হল-ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো কি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈধ আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দিতে পারে, অথচ সেই পরিচয়কে অন্য সম্প্রদায়কে বর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হতে না দিয়ে? মেঘালয়ের আদিবাসী সমাজের জমি, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু সেই সুরক্ষা অন্য সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক নিরাপত্তার বিনিময়ে হতে পারে না।

উত্তর-পূর্ব ভারতে জাতীয় নিরাপত্তার চূড়ান্ত পরীক্ষা তাই কেবল রাষ্ট্র তার রাস্তা ও সীমান্ত কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে না। আসল পরীক্ষা হবে-পরিচয়ের রাজনীতি যাতে সেই রাস্তা ও সীমান্তকেই স্থায়ী অভ্যন্তরীণ বিভাজনের রেখায় পরিণত না করে, রাষ্ট্র তা কতটা সফলভাবে প্রতিরোধ করতে পারে।

কারণ যখন এক সম্প্রদায়ের স্মৃতি অন্য সম্প্রদায়ের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠে, যখন একটি গাড়ির নম্বরপ্লেট তার যাত্রীর পরিচয়ের রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, এবং যখন দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যবর্তী সড়ক প্রতিশোধের মঞ্চে পরিণত হয়-তখন জাতীয় নিরাপত্তার সংকট আর কেবল দেশের ভৌগোলিক প্রান্তসীমায় অবস্থান করে না; তা এসে উপস্থিত হয় প্রজাতন্ত্রের সামাজিক বুননের অভ্যন্তরেই।

মৌনমুখর ঘোষ is a Guest Faculty in the Department of Political Science at Ramakrishna Mission Residential College (Autonomous), Kolkata, and serves as Vice-Chair of GISRC, IAPSS. His areas of interest include politics, Gender, society, identity, and contemporary issues in India and the Northeast.

Leave A Reply

Exit mobile version