কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক: দেশের কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর, যা “চিকেন নেক” নামেও পরিচিত, সেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা পরিকাঠামোর জন্য দীর্ঘদিনের আটকে থাকা জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে নতুন রাজ্য প্রশাসনের অধীনে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah সম্প্রতি রাজ্য সফরে গিয়ে জানান, ২০১৪ সাল থেকে বকেয়া থাকা ১১২৯ একর জমির মধ্যে ১১০০ একর হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে নতুন সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যেই। এই জমি ব্যবহার করা হবে সীমান্ত বেষ্টনী এবং নিরাপত্তা পরিকাঠামো সম্পূর্ণ করার কাজে।
উত্তর পূর্ব ভারতের আটটা রাজ্যকে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তকারী একমাত্র স্থলপথ শিলিগুড়ি করিডোর, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ মাত্র ২২ কিলোমিটার। নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সীমান্তের মাঝে এবং তিব্বতের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই সংকীর্ণ করিডোরকে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভৌগোলিক অঞ্চলগুলোর একটা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই এলাকায় সীমান্ত নিরাপত্তা পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার অবসান হয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জমি হস্তান্তরের বিস্তারিত
Amit Shah জানান, ২০১৪ সাল থেকে Border Security Force এবং Sashastra Seema Bal এর জন্য প্রয়োজনীয় জমি চেয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বারবার অনুরোধ জানিয়েছিল তৎকালীন রাজ্য সরকারের কাছে, কিন্তু তা দীর্ঘ ১২ বছর ধরে অমীমাংসিত থেকে যায়। নতুন রাজ্য সরকার গঠনের পর মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে মোট ১১২৯ একর জমির মধ্যে ১১০০ একর হস্তান্তর সম্পন্ন হয়ে যায়। বাকি ২৯ একর জমির বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একটা প্রাতরাশ বৈঠকে আলোচনার পর সেই জমিরও দ্রুত হস্তান্তরের আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। এই প্রসঙ্গে সাবেক রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে Amit Shah বলেন, তারা বারবার Mamata Banerjee কে অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও তিনি এই জমি হস্তান্তর করেননি, এমনকি তার কার্যালয়ে গিয়ে সরাসরি বুঝিয়ে বলার পরেও। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সমালোচনা একান্তই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজস্ব বক্তব্য, যার পাল্টা প্রতিক্রিয়া সাবেক রাজ্য সরকারের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি।
ত্রিভুজাকার নিরাপত্তা বলয়
এই নতুন জমি ব্যবহার করে গড়ে তোলা হচ্ছে একটা ত্রিভুজাকার নিরাপত্তা বলয়, যার মূল কেন্দ্র থাকবে Chopra, Kishanganj এবং Dhupguri তে। শুধু চিকেন নেক এলাকা সুরক্ষিত করার জন্যই আলাদাভাবে ৫৬০ একর জমি অনুমোদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই ত্রিভুজাকার কাঠামোর মাধ্যমে সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী একযোগে নজরদারি চালাতে পারবে গোটা করিডোর জুড়ে, যা নেপাল ও ভুটানের মতো তুলনামূলক খোলা সীমান্ত এবং বাংলাদেশের সীমান্ত, উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে।
SSB এর নতুন পরিকাঠামো
প্রায় ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক নতুন পরিকাঠামো প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন Amit Shah। এর মধ্যে রয়েছে শিলিগুড়ির Ranidanga এলাকায় ৮০ একর জমিতে SSB র নতুন প্রশাসনিক সদর দপ্তর, Thakurganj এ ১৯ নম্বর ব্যাটালিয়ন এবং Kishanganj এ ১২ নম্বর ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো, এবং New Jalpaiguri তে একটা নতুন আউটপোস্ট ক্যাম্প। এই পরিকাঠামোগুলো সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জওয়ানদের জন্য প্রশাসনিক এবং আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করবে বলে জানানো হয়েছে।
নতুন ফৌজদারি আইন প্রয়োগ
সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজ্যে নতুন তিনটে ফৌজদারি আইন, Bharatiya Nyaya Sanhita, Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita এবং Bharatiya Sakshya Adhiniyam কার্যকর করা হয়েছে নতুন সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই। এই আইনগুলোর বাস্তবায়নে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তিনটে বিষয়ে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফরেনসিক তদন্ত, তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং FIR থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তিন বছরের মধ্যে চূড়ান্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপগুলো সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম এবং তোলাবাজির বিরুদ্ধে একটা কড়া বার্তা।
অন্যান্য উদ্বোধনী কর্মসূচি
সফরকালে Amit Shah উদ্বোধন করেন নবনির্মিত Bidhannagar Police Commissionerate ভবন, যা এই উচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ এবং বহু মানুষের যাতায়াতের এলাকায় পুলিশি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া North Bengal Medical College and Hospital এ একটা ২০ শয্যার মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রেরও উদ্বোধন করেন তিনি, যা সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক পাচারজনিত সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন তিনটে ফৌজদারি আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে শিলিগুড়ির Kawakhali ময়দানে ছয় দিনের একটা প্রদর্শনীরও উদ্বোধন করা হয়।
উপসংহার
শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা পরিকাঠামো নিয়ে সাম্প্রতিক এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে দেশের কৌশলগত নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘদিনের আটকে থাকা জমি হস্তান্তর দ্রুত সম্পন্ন হওয়া, নতুন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা এবং ফৌজদারি আইন সংস্কার, এই সবকিছু মিলিয়ে কেন্দ্র এবং রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়ের একটা নতুন দৃষ্টান্ত তুলে ধরছে সরকার। তবে এই ঘটনাক্রম নিয়ে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে সাবেক রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ নিয়ে, তার একটা সুষম মূল্যায়নের জন্য ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য শোনা জরুরি হয়ে উঠবে। সীমান্ত নিরাপত্তা একটা জাতীয় স্বার্থের বিষয়, তাই এই ধরনের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে দ্রুত বাস্তবায়িত হওয়াই সবচেয়ে কাম্য।
