Thursday, August 20, 2026

অর্থনীতি ডেস্ক: ২০২৫ ২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মহিষের মাংস রপ্তানি রেকর্ড গড়ে পৌঁছেছে ৫১০ কোটি মার্কিন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫.৬ শতাংশ বেশি। Uzbekistan এবং Russia র মতো নতুন বাজারে প্রবেশ এবং প্রতি টনে আয় বৃদ্ধির হাত ধরে কৃষিপণ্য রপ্তানির তালিকায় শীর্ষস্থানীয় পণ্য হয়ে উঠেছে মহিষের মাংস। বাণিজ্য মন্ত্রক আশা করছে চলতি অর্থবর্ষে এই রপ্তানির মূল্য ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

ভারতীয় কৃষি রপ্তানির ক্ষেত্রে মহিষের মাংস এখন এক অপ্রত্যাশিত সাফল্যের গল্প। একটা সময় যে পণ্য মূলত দুগ্ধ শিল্পের একটা উপজাত হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ সেই মহিষের মাংসই হয়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে সফল কৃষি রপ্তানি পণ্যগুলোর একটা। ২০২৫ ২৬ অর্থবর্ষে এই খাতে যে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা শুধু সংখ্যার হিসেবে নয়, বরং একটা কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটা দেশের গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি এবং কৃষি রপ্তানির সার্বিক লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

রেকর্ড রপ্তানির পেছনের হিসেব

২০২৫ ২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মহিষের মাংস রপ্তানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫১০ কোটি ডলার, যা আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড ২০১৪ ১৫ অর্থবর্ষের ৪৭৮ কোটি ডলারকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই দুটো সংখ্যার মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফারাক আছে। ২০১৪ ১৫ সালে ১৪.৮ লক্ষ টন মাংস রপ্তানি করে এই আয় হয়েছিল, যেখানে প্রতি টনের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৩২৪০ ডলার। বর্তমান রেকর্ডে টনপ্রতি আয়ের পরিমাণ আরও অনেক বেশি বলে জানা যাচ্ছে, যদিও সাম্প্রতিক রপ্তানির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনও স্পষ্ট নয়। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, রপ্তানির এই বৃদ্ধি শুধু পরিমাণ বাড়ার কারণে নয়, বরং প্রতি ইউনিটে বেশি মূল্য অর্জনের কারণেও ঘটেছে।

২০১৪ ১৫ সালের শীর্ষে পৌঁছানোর পর এই খাতে দীর্ঘ একটা মন্থর পর্যায় দেখা দিয়েছিল, ২০২০ ২১ অর্থবর্ষে রপ্তানি নেমে আসে ৩১৭ কোটি ডলারে, আর তারপর বেশ কয়েক বছর প্রায় স্থবির অবস্থায় থাকে। বর্তমান উত্থান সেই দীর্ঘ মন্থর পর্যায়ের সম্পূর্ণ অবসান ঘটিয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শীর্ষ আমদানিকারক দেশগুলো

এখনও পর্যন্ত ভারতের মহিষের মাংসের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ Vietnam, যেখানে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৯৩ কোটি ৩৯ লক্ষ ডলার। এরপরই রয়েছে Egypt, প্রায় ৭২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার নিয়ে, এবং Malaysia, প্রায় ৬৫ কোটি ৪১ লক্ষ ডলার নিয়ে। এছাড়া UAE তে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি ৪২ লক্ষ ডলারের মাংস, আর Saudi Arabia য় প্রায় ৩৫ কোটি ৯৩ লক্ষ ডলারের। এই পাঁচটা দেশ মিলিয়ে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬১ শতাংশ আসে, যা একদিকে যেমন একটা স্থিতিশীল ভিত্তি তৈরি করে, তেমনি নির্দিষ্ট কয়েকটা দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও তুলে ধরে।

নতুন বাজারের উত্থান

সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হলো নতুন বাজারে প্রবেশ। Uzbekistan এই তালিকায় সবচেয়ে চমকপ্রদ নাম, যেখানে রপ্তানির পরিমাণ পৌঁছেছে প্রায় ৩০ কোটি ৭০ লক্ষ ডলারে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৬ শতাংশ। এটা একটা সম্পূর্ণ নতুন বাজারের জন্য অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটা সংখ্যা। এর পাশাপাশি Russia, Oman এবং Senegal ও নতুন বাজার হিসেবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে Senegal এ প্রবেশ পশ্চিম আফ্রিকায় একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর Russia ও Uzbekistan এ সাফল্য ভবিষ্যতে Commonwealth of Independent States বা CIS অঞ্চলের অন্যান্য দেশে প্রবেশের একটা সম্ভাব্য পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।

২০২৫ ২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মহিষের মাংস রপ্তানি রেকর্ড ৫১০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, নতুন বাজারেও বাড়ছে রপ্তানি। ছবির উৎস: দ্য কলকাতা হেরাল্ডের সম্পাদকীয় গ্রাফিক্স বিভাগ
দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গে সংযোগ

মহিষের মাংস রপ্তানির এই বৃদ্ধি দেশের দুগ্ধ অর্থনীতির জন্যও একটা বড় সহায়ক শক্তি হয়ে উঠছে। ভারতে মহিষের মাংস মূলত দুগ্ধ শিল্পের একটা উপজাত পণ্য, তাই মাংসের মূল্য বাড়লে পশুর সামগ্রিক অবশিষ্ট মূল্যও বেড়ে যায়। এর ফলে দুগ্ধ খামারিদের জন্য এটা একধরনের আর্থিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে, যা দুধ উৎপাদনের খরচ কিছুটা হলেও লাঘব করে এবং গ্রামীণ পশুপালন সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করে তোলে।

চলতি অর্থবর্ষের লক্ষ্যমাত্রা

২০২৬ ২৭ অর্থবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত, রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৬.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছেছে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাণিজ্য মন্ত্রকের নির্ধারিত ৬০০ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রা সহজেই অর্জিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা, এমনকি মরশুমি চাহিদার তারতম্য বিবেচনায় না নিলেও। তবে এই লক্ষ্য ছাড়িয়ে যেতে হলে Russia এবং Senegal এর মতো নতুন বাজারে আক্রমণাত্মকভাবে সম্প্রসারণ চালিয়ে যাওয়া এবং প্রতি টনে উচ্চ মূল্য অর্জনের ধারা বজায় রাখাই হবে মূল কৌশলগত অগ্রাধিকার।

উপসংহার

ভারতের মহিষের মাংস রপ্তানির এই উত্থান শুধু একটা বাণিজ্যিক সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটা প্রমাণ করে কীভাবে একটা ঐতিহ্যবাহী কৃষি উপজাত পণ্যকেও কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে একটা উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। নতুন বাজারে প্রবেশ, প্রতি টনে উচ্চতর মূল্য অর্জন এবং দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গে এই খাতের সংযোগ, এই তিনটে বিষয় একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে একটা টেকসই প্রবৃদ্ধির মডেল। তবে শীর্ষ পাঁচ দেশের উপর রপ্তানির উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা এখনও একটা ঝুঁকির বিষয় হয়ে থেকে গেছে, যা মোকাবিলায় বাজার বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাই হবে ভবিষ্যতের মূল চ্যালেঞ্জ।

Leave A Reply

Exit mobile version