সংক্ষিপ্ত সার: কানাডার সঙ্গে হাজার কোটি ডলারের ইউরেনিয়াম চুক্তির পরে এবার উজবেকিস্তানের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ কাঠামো নিয়ে এগোচ্ছে ভারত। অথচ দেশের নিজের মাটিতেই মজুত আছে চার লক্ষের বেশি টন ইউরেনিয়াম আকরিক। মেঘালয়ের মতো রাজ্যের আপত্তিতে সেই সম্পদ তোলাই যাচ্ছে না, ফলে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দিল্লিকে বারবার তাকাতে হচ্ছে বিদেশের দিকে।
পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে গেলে চাই নিরবচ্ছিন্ন ইউরেনিয়াম সরবরাহ। ভারতের সামনে এখানে একটা অদ্ভুত বাস্তবতা কাজ করছে। দেশের ভূগর্ভে সম্পদ কম নেই, কিন্তু সেই সম্পদ তুলে জ্বালানিতে পরিণত করার পথে বাধা অনেক। ফলে একদিকে দেশীয় খনির চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে একের পর এক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি করে যাচ্ছে দিল্লি।
কানাডার সঙ্গে বড় বাঁধা চুক্তি
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটা এসেছে কানাডার দিক থেকে। ওই দেশের সংস্থা ক্যামেকো এবছর ভারতের সঙ্গে একটা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে, যাতে ২০২৭ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতকে প্রায় বাইশ মিলিয়ন পাউন্ড ইউরেনিয়াম আকরিক ঘনীভূত সরবরাহ করা হবে। চুক্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় দুই দশমিক ছয় বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার। এই একটা চুক্তিই আগামী প্রায় এক দশকের জন্য ভারতের ইউরেনিয়াম সরবরাহের একটা বড় অংশ নিশ্চিত করে দিচ্ছে।
উজবেকিস্তান কোনও নতুন নাম নয়
কানাডার চুক্তির পাশাপাশি এবার আলোচনায় উজবেকিস্তান। তাসখন্দে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিওয়েভের বৈঠকে দুই দেশ ইউরেনিয়াম সরবরাহের একটা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সহমত হয়েছে। তবে এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার। এটা এখনই চূড়ান্ত স্বাক্ষরিত কোনও নতুন সরবরাহ চুক্তি নয়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনা ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে এবং চুক্তিকে দ্রুত চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আসলে উজবেকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ইউরেনিয়াম সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উজবেক সংস্থা নাভোইইউরানের সঙ্গে ভারতের আগে থেকেই একটা মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত চুক্তি ছিল, যার মেয়াদ ছিল ২০২৬ সাল পর্যন্ত। মোট ১১০০ মেট্রিক টন ইউরেনিয়ামের মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রায় ৬০০ মেট্রিক টন সরবরাহ হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক আলোচনাকে নতুন করে শুরু হওয়া কোনও সম্পর্ক না বলে, পুরনো সহযোগিতারই পরবর্তী ধাপ বলাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।
শুধু ইউরেনিয়াম নয়, তাসখন্দ বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং ডিজিটাল পরিকাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই দেশ নিজেদের সম্পর্ককে কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ স্তরে উন্নীত করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচশো কোটি ডলার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের লক্ষ্য স্থির করেছে।
নিজের মাটিতেই যা মজুত আছে
এবার আসা যাক দেশের নিজস্ব ভাণ্ডারের কথায়। অ্যাটমিক মিনারেলস ডিরেক্টরেট ফর এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড রিসার্চ বা AMD এর তথ্য অনুযায়ী ভারতে চিহ্নিত ইউরেনিয়াম আকরিকের পরিমাণ প্রায় চার লক্ষ বিয়াল্লিশ হাজার আটশো টন। অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, ঝাড়খণ্ড, মেঘালয় এবং রাজস্থানে ছড়িয়ে আছে এই সম্পদ। তবে ভূগর্ভে সম্পদ থাকা আর তা বাস্তবে অর্থনৈতিকভাবে তুলে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা, এই দুটো এক জিনিস নয়।
মেঘালয়ের বড় ধাক্কা
এই ফারাকটাই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে সাম্প্রতিক এক ঘটনায়। গত ২৬ অগস্ট মেঘালয় বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে একটা প্রস্তাব পাশ হয়েছে, যেখানে রাজ্যে ইউরেনিয়াম খনন এবং আকরিক প্রক্রিয়াকরণের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে সাংমার আনা এই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছেন ষাট জন বিধায়ক। কেন্দ্র, পরমাণু শক্তি দফতর এবং ইউরেনিয়াম কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেডের কাছে রাজ্যে খনন বন্ধ রাখার আবেদন জানানো হয়েছে প্রস্তাবে, বিশেষত পশ্চিম খাসি পাহাড়ের কাইলেং পিন্দেংসোহিয়ং মাওথাবাহ প্রকল্পের বিরুদ্ধে। জমির অধিকার, স্থানীয় মানুষের সম্মতি, পরিবেশ এবং জলসম্পদের প্রশ্নকেই সামনে রেখেছে রাজ্য সরকার।
তেলঙ্গানাতেও একই ধরনের প্রতিরোধের ছবি বহু বছর ধরে দেখা যাচ্ছে। বিশেষত নাল্লামালা এবং অমরাবাদ এলাকায় আদিবাসী এবং পরিবেশ সংগঠনগুলির আপত্তিতে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া বারবার থমকে গিয়েছে।
তাহলে কি স্থলপথই সবচেয়ে নিরাপদ
উজবেকিস্তানের ভৌগোলিক নৈকট্যকে অনেকেই সমুদ্রপথের ঝুঁকি এড়ানোর একটা সহজ বিকল্প হিসেবে দেখাতে চান। তবে এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। উজবেকিস্তান একটা স্থলবেষ্টিত দেশ, এবং সেখান থেকে ঠিক কোন রেলপথ বা সড়কপথে ইউরেনিয়াম ভারতে আসবে, তার বিস্তারিত পরিকাঠামো এখনও প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। ফলে নিছক মানচিত্রে দূরত্ব কম বলেই এই সরবরাহ পথ কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় সবসময় নিরাপদ, এমন সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো করে পৌঁছনো ঠিক হবে না। উজবেকিস্তানের আসল গুরুত্ব বরং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সামগ্রিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার মধ্যেই নিহিত।
আসল লড়াইটা কোথায়
ভারতের ইউরেনিয়াম কৌশলের আসল প্রশ্নটা তাই বিদেশ থেকে কতটা কেনা হবে তা নয়। প্রশ্নটা হল, দেশের নিজস্ব সম্পদ কতটা বাস্তবে ব্যবহার করা যাবে। কানাডা, কাজাখস্তান, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং উজবেকিস্তানের মতো একাধিক দেশের সঙ্গে সরবরাহ বৈচিত্র্য বাড়িয়ে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে ঠিকই, কিন্তু মেঘালয়ের মতো রাজ্যে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করে খনন শুরু করা না গেলে, বিদেশ নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে বই কমবে না।
উপসংহার
ভারতের ইউরেনিয়াম কূটনীতি আসলে একটা খনিজের গল্পের চেয়ে অনেক বড়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি নিরাপত্তা, রাজ্য ও কেন্দ্রের সম্পর্ক, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সবকিছুই। কানাডার বড় চুক্তি হোক বা উজবেকিস্তানের সঙ্গে পুরনো সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, কোনওটাই দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার পুরো সমাধান নয়। শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রকৃত জ্বালানি স্বনির্ভরতা নির্ভর করবে একটা কঠিন ভারসাম্যের উপর, আন্তর্জাতিক সরবরাহ পথ যতটা নিরাপদ করা যায়, ততটাই জরুরি নিজের মাটির নিচে থাকা সম্পদ নিয়ে স্থানীয় মানুষের ভরসা অর্জন করা।
