সংক্ষিপ্ত সারাংশ: সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বৃষ্টিভেজা এক সন্ধ্যায় ইতিহাস লিখল ইস্টবেঙ্গল। ২০২৬ সালের ডুরান্ড কাপ ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বাইশ বছরের ট্রফি খরা কাটাল লাল হলুদ শিবির। এডমুন্ড লালরিনডিকার প্রথমার্ধের হ্যাটট্রিকে ভর করে এই জয়, যার সুবাদে ইস্টবেঙ্গল পৌঁছে গেল ১৭টা ডুরান্ড কাপ শিরোপা নিয়ে মোহনবাগানের সমান আসনে। কোচ Antonio Lopez Habas এর কৌশলগত মাস্টারক্লাসই এই জয়ের মূল কারিগর বলে মনে করছেন ফুটবলবিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বজিৎ দাস: বাইশ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে স্বপ্নপূরণ, মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ১৩৫তম ডুরান্ড কাপের ফাইনাল জিতে নিল লাল হলুদ শিবির, এই জয়ের সুবাদে ১৭টা ডুরান্ড কাপ শিরোপা নিয়ে মোহনবাগানের পাশে একই আসনে বসে পড়ল ইস্টবেঙ্গল। তবে এই জয়ের গল্প শুধু নব্বই মিনিটের মাঠের লড়াই নয়, এই সাফল্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সত্তর বছর বয়সী এক মানুষের মগজাস্ত্র, অ্যান্তোনিও লোপেজ হাবাস, তারই হাত ধরে এই মরশুমে প্রথম ট্রফির স্বাদ পেল লাল হলুদ বাহিনী। অথচ মরশুমের শুরুটা মোটেই ভালো হয়নি ইস্টবেঙ্গলের জন্য, ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই এই মোহনবাগানের কাছে ১-০ গোলে হারতে হয়েছিল তাদের, তাই আজকের এই জয়কে অনায়াসেই বলা যায় সেই হারের এক মধুর প্রতিশোধ। এই জয়ের নেপথ্যে কাজ করেছে একাধিক কারণ, প্রথমত অ্যান্তোনিও লোপেজ হাবাসের কৌশলগত মুন্সিয়ানাই দুই দলের মধ্যে ফারাক গড়ে দিয়েছে, যে হাবাস মূলত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলাতেই অভ্যস্ত, আজ শুরু থেকেই তিনি আক্রমণের রণকৌশল নিয়ে ঝাঁপিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ফুটবল যে আসলে একটা দলগত খেলা, আজ আরও একবার সেটাই প্রমাণ করে দিল ইস্টবেঙ্গল, দলের মধ্যেকার ঐক্য, শৃঙ্খলা, হার না মানার মানসিকতা এবং প্লেয়ারদের আত্মবিশ্বাসই তাদের এনে দিয়েছে এই ট্রফি। তৃতীয়ত, হার্দিক ভাট এবং অধিনায়ক মহম্মদ রশিদের পারফরম্যান্স আজ সবার মন জয় করে নিয়েছে, আর সবশেষে আজকের আসল নায়ক এডমুন্ড লালরিনডিকা, যিনি একাই দুই দলের মধ্যেকার পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন। ২০২৫-২৬ মরশুমে ISL চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এই মরশুমের শুরুটাও যেভাবে হলো, তা নিঃসন্দেহে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মনে জ্বালিয়ে দেবে নতুন আশার আলো।
এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো ফুটবল টুর্নামেন্ট ডুরান্ড কাপের ১৩৯ বছরের ইতিহাসে ইস্ট বেঙ্গল মোহনবাগান দ্বৈরথ বরাবরই বিশেষ মর্যাদা পেয়ে এসেছে। ২০০৪ সালের পর থেকে এই টুর্নামেন্টে ইস্টবেঙ্গলের ট্রফি খরা চলছিল, যা এবার অবসান হলো ২৩ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে। প্রবল বর্ষণ এবং আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যেও যুবভারতীতে হাজির হওয়া হাজার হাজার সমর্থকের সামনে লাল হলুদ শিবির তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে প্রমাণ করল, প্রতিশোধ কখনো কখনো এতটাই মধুর হতে পারে।
ম্যাচের ফলাফল এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ফাইনাল স্কোর | ইস্টবেঙ্গল ৪ – ১ মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট |
| ভেন্যু | যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন, সল্টলেক |
| তারিখ | ২৩ আগস্ট, ২০২৬ |
| প্রথমার্ধের সম্ভাবনা দখল | মোহনবাগান ৫৭ শতাংশ, ইস্টবেঙ্গল ৪৩ শতাংশ |
| প্রথমার্ধে গোলমুখী শট | মোহনবাগান ৮টা, ইস্টবেঙ্গল ৭টা |
| সেরা খেলোয়াড় (Golden Ball) | এডমুন্ড লালরিনডিকা (ইস্টবেঙ্গল) |
| সেরা গোলরক্ষক (Golden Glove) | বিশাল কাইথ (মোহনবাগান) |
| সর্বোচ্চ গোলদাতা (Golden Boot) | আলাউদ্দিন আজরায়ি (নর্থইস্ট ইউনাইটেড) |
| শিরোপা সংখ্যা | দুই দলেরই এখন ১৭টা করে |
গোলের খুঁটিনাটি
প্রথমার্ধেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়, যেখানে মাত্র ৪৪ মিনিটের মধ্যে পাঁচটা গোল দেখে ফেলে যুবভারতী।
| মিনিট | গোলদাতা | দল | স্কোরলাইন |
|---|---|---|---|
| ১০ | বিপিন সিং | ইস্টবেঙ্গল | ১-০ |
| ১২ | এডমুন্ড লালরিনডিকা | ইস্টবেঙ্গল | ২-০ |
| ২২ | এডমুন্ড লালরিনডিকা | ইস্টবেঙ্গল | ৩-০ |
| ৩৩ | মনবীর সিং | মোহনবাগান | ৩-১ |
| ৪৪ | এডমুন্ড লালরিনডিকা | ইস্টবেঙ্গল | ৪-১ |
দশ মিনিটে অধিনায়ক Mohamad Basim Rashid র নিখুঁত থ্রু পাস থেকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন বিপিন সিং। এর দুই মিনিট পরেই বক্সের বাইরে থেকে একটা শট নেন এডমুন্ড, যা সামান্য ডিফ্লেক্ট হয়ে গোলরক্ষক বিশাল কাইথকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। ২২ মিনিটে Daniel Ramirez এর পাস থেকে বল পেয়ে গোলরক্ষককে কাটিয়ে ফাঁকা জালে বল ঠেলে দেন এডমুন্ড, যা তার এবং দলের তৃতীয় গোল। মোহনবাগানের একমাত্র গোলটা আসে মনবীর সিং এর পা থেকে, যেখানে তিনি ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ের শক্তিশালী শটে ব্যবধান কমান। তবে বিরতির ঠিক আগে জয় গুপ্তার ক্রস থেকে ট্যাপ ইন করে নিজের হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন এডমুন্ড, যা কার্যত ম্যাচের ফলাফল নিশ্চিত করে দেয়।
হাবাসের কৌশলগত মাস্টারক্লাস
এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে কোচ Antonio Lopez Habas এর কৌশলগত পরিকল্পনা। মোহনবাগানের শক্তিশালী আক্রমণভাগকে সামাল দিতে তিনি ৫-৪-১ ফরমেশনে দল সাজান, যেখানে আক্রমণভাগের খেলোয়াড় Jesin TK কে বেঞ্চে বসিয়ে রক্ষণে নিয়ে আসেন Lalchungnunga কে। এই সিদ্ধান্তের ফলে এডমুন্ডকে একক স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানোর একটা কৌশলগত ঝুঁকি নিতে হয় হাবাসকে, যা শেষ পর্যন্ত অসাধারণভাবে কার্যকর হয়।
দ্বিতীয়ার্ধে ইস্টবেঙ্গল সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলে, যাকে ফুটবলের পরিভাষায় “লো ব্লক” বলা হয়। মোহনবাগান বল দখলে এগিয়ে থাকলেও তারা ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। এই সময় মোহনবাগানের তারকা স্ট্রাইকার Jamie Maclaren দুইবার সহজ সুযোগ নষ্ট করেন, যা মোহনবাগান শিবিরের হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়।
রক্ষণভাগের দৃঢ়তা
ইস্টবেঙ্গলের পাঁচ জনের রক্ষণভাগ, Hardik Bhatt, Anwar Ali, Lalchungnunga, Sandip Mandi এবং Jay Gupta, পুরো ম্যাচ জুড়ে অসাধারণ শৃঙ্খলা বজায় রাখে। বিশেষ করে Anwar Ali, যিনি একসময় মোহনবাগানেই খেলতেন, তার প্রাক্তন সতীর্থদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখান। গোলরক্ষক Prabhsukhan Gill ৩৯ মিনিটে একটা গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে বিপদমুক্ত রাখেন।
মোহনবাগান শিবিরে হতাশা
মাত্র ১২ মিনিটের মধ্যে তিন গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মোহনবাগান শিবির রীতিমতো হতবিহ্বল হয়ে পড়ে বলে জানা গেছে। কোচ Panagiotis Dilmperis বিরতির আগেই দলে একাধিক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেন, আর বিরতির পর বড় পরিবর্তন করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা Sahal Abdul Samad কে মাঠে নামান, যিনি শুরুর একাদশে ছিলেন না। তবে এই পরিবর্তনও মোহনবাগানকে ম্যাচে ফেরাতে ব্যর্থ হয়।
মাথাপিছু পরিসংখ্যানে ইতিহাস
| পরিসংখ্যান | তথ্য |
|---|---|
| ডুরান্ড কাপে মোট শিরোপা | ইস্টবেঙ্গল ১৭, মোহনবাগান ১৭ |
| ফাইনালে মুখোমুখি সাক্ষাৎ | ইস্টবেঙ্গল ৬ জয়, মোহনবাগান ৫ জয়, ২টা যৌথ শিরোপা |
| সব মিলিয়ে মোট ম্যাচ | ৪০২টা |
| সামগ্রিক জয়ের হিসেব | ইস্টবেঙ্গল ১৪১, মোহনবাগান ১৩২, ড্র ১২৯ |
| শেষ ডুরান্ড শিরোপা জয় | ২০০৪ সাল (২২ বছরের খরার অবসান) |
এই জয়ের ফলে ডুরান্ড কাপ ফাইনালে দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে ইস্টবেঙ্গল এখন এগিয়ে গেল ৬-৫ ব্যবধানে।
উপসংহার
বাইশ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইস্টবেঙ্গলের এই ডুরান্ড কাপ জয় শুধু একটা ট্রফি জয়ের গল্প নয়, বরং এটা প্রমাণ করে দিল দলগত ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং একজন অভিজ্ঞ কোচের সঠিক কৌশল কীভাবে একটা দলকে বদলে দিতে পারে। মরশুমের শুরুতেই মোহনবাগানের কাছে হারের প্রতিশোধ নিয়ে ইস্টবেঙ্গল যেভাবে এই জয় ছিনিয়ে আনল, তা লাল হলুদ সমর্থকদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করবে। গত মরশুমে ISL চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এবারের মরশুমের শুরুটাও এমন দুর্দান্তভাবে হওয়ায় ইস্টবেঙ্গল শিবির নিশ্চিতভাবেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে এগোবে আসন্ন প্রতিযোগিতাগুলোর দিকে।


