সংক্ষিপ্তসার: নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলন ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে উঠে এসেছে ভিন্নমত। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা পি চিদম্বরম সাম্প্রতিক BRICS বৈঠকগুলি থেকে ভারতের কী বাস্তব লাভ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর ভারতের আয়োজক হওয়ার কূটনৈতিক গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার কথা তুলে ধরে সম্মেলনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : BRICS নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক এবার কিছুটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। একদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশগ্রহণের বাস্তব ফল কতটা মিলছে, সেই প্রশ্ন। অন্যদিকে রয়েছে একটি বৃহৎ বহুপাক্ষিক সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, সেই মূল্যায়ন। কংগ্রেসের দুই পরিচিত মুখ পি চিদম্বরম এবং শশী থারুরের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কী প্রশ্ন তুলেছেন পি চিদম্বরম?
দিল্লিতে BRICS সম্মেলনের প্রস্তুতির মধ্যেই পি চিদম্বরম সাম্প্রতিক BRICS বৈঠকগুলির ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গা ছিল, আন্তর্জাতিক সংগঠনে ভারতের সদস্যপদ বা একের পর এক সম্মেলন আয়োজনের পাশাপাশি দেশের জন্য বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য ফল কতটা আসছে, সেটিও দেখা প্রয়োজন।
চিদম্বরমের প্রশ্ন শুধু BRICS নিয়ে নয়। তিনি BRICS-এর পাশাপাশি SCO, G20 এবং Quad-এর মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করে জানতে চান, এই সংগঠনগুলি থেকে ভারতের অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী ধরনের বাস্তব সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক দুই বা তিনটি BRICS সম্মেলন থেকে তিনি উল্লেখযোগ্য tangible benefits বা tangible results দেখতে পাননি। এখানে চিদম্বরমের বক্তব্যকে সরাসরি BRICS বিরোধিতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি accountability প্রশ্ন হিসেবেও দেখা যায়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের অংশগ্রহণের পাশাপাশি সেই অংশগ্রহণের ফলাফল কী, তা নিয়ে সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলা বিরোধী রাজনীতির একটি স্বাভাবিক অংশ।
অন্য সুর শশী থারুরের
চিদম্বরমের বক্তব্যের পরেই BRICS নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন শশী থারুর। তাঁর মতে, এই সম্মেলনের গুরুত্ব শুধুমাত্র অর্থনৈতিক চুক্তি বা তাৎক্ষণিক ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। থারুর বিশেষ করে Global South-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, BRICS-এর ১১টি সদস্য দেশ বিশ্বের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এবং বৈশ্বিক GDP-র প্রায় ৪১ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ভারতের সভাপতিত্বে এই দেশগুলিকে এক জায়গায় আনা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সক্ষমতার প্রকাশ। ভারতের আয়োজক হওয়ার বিষয়টিকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, একাধিক রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানকে একই মঞ্চে নিয়ে আসার ক্ষমতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের diplomatic convening power-এর একটি প্রকাশ। এই আয়োজক হওয়ার বিষয়টি তিনি ভারতের জন্য একটি বড় মর্যাদার বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাহলে কি দুজনের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী?
দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে, তবে বিষয়টিকে সরলভাবে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংঘাত হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। চিদম্বরম মূলত জানতে চাইছেন, BRICS থেকে ভারতের কী বাস্তব ফল পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক সুবিধা, জাতীয় স্বার্থ এবং measurable outcomes। অন্যদিকে থারুর জোর দিচ্ছেন কূটনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের উপর। তাঁর বক্তব্যে BRICS-এর মূল্য শুধু চুক্তি বা অর্থনৈতিক ফলাফলে নয়, বরং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতাদের সঙ্গে এক মঞ্চে বসা এবং Global South-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে একত্রিত করার মধ্যেও রয়েছে। অর্থাৎ একটি দৃষ্টিভঙ্গি ফলাফলকে মাপতে চাইছে সংখ্যায়, অন্যটি গুরুত্ব দিচ্ছে কূটনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবকে।
BJP-র পাল্টা আক্রমণ
দুই কংগ্রেস নেতার বক্তব্যের পার্থক্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে BJP। দলের মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি দাবি করেছেন, BRICS নিয়ে কংগ্রেসের মধ্যেই ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ্যে এসেছে। তাঁর বক্তব্যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে দলীয় অসঙ্গতি হিসেবে। তবে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা এবং প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ চিদম্বরমের বক্তব্যকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, চিদম্বরম যদি সতর্ক করছেন, তা হলে সেটিকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নিয়ে সম্মেলন থেকে আরও ভালো ফল পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এই প্রতিক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, চিদম্বরমের বক্তব্যকে কেবল BRICS বিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখার বদলে তার মধ্যে নীতিগত প্রশ্নও খোঁজা হচ্ছে।
BRICS সম্মেলনের সামনে আসল পরীক্ষা
ভারতের জন্য এবার বড় প্রশ্ন হল, আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং কূটনৈতিক দৃশ্যমানতাকে কতটা বাস্তব ফলাফলে পরিণত করা যায়। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে হতে চলা ১৮তম BRICS সম্মেলনে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবিলা, critical supply chains, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, technology এবং global governance-এর মতো বিষয় আলোচনায় রয়েছে। ভারত ২০২৬ সালে BRICS-এর সভাপতিত্ব করছে এবং এবারের মূল ভাবনা resilience, innovation, cooperation এবং sustainability-কে কেন্দ্র করে। ফলে চিদম্বরমের প্রশ্ন এবং থারুরের ব্যাখ্যা দুটিই আগামী দিনে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ পাবে। সম্মেলন থেকে যদি বাস্তব অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত বা কূটনৈতিক উদ্যোগ বেরিয়ে আসে, তা হলে BRICS-এর কার্যকারিতা নিয়ে সরকারের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তৈরি হবে। আবার ঘোষণার বাইরে বাস্তব অগ্রগতি কম হলে tangible benefits নিয়ে প্রশ্নও আরও জোরালো হতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনও বহুপাক্ষিক সম্মেলনের সাফল্য সবসময় একটি মাত্র মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না। একটি দেশের জন্য আন্তর্জাতিক মর্যাদা, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, Global South-এর নেতৃত্ব এবং কূটনৈতিক প্রভাব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা। এই জায়গাতেই BRICS নিয়ে বর্তমান বিতর্কটি তাৎপর্যপূর্ণ। চিদম্বরমের প্রশ্ন সরকারকে বাস্তব ফলাফল দেখানোর দিকে চাপ দিতে পারে। থারুরের বক্তব্য মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিছু অর্জনের মূল্য সরাসরি অর্থের অঙ্কে মাপা যায় না।
উপসংহার
BRICS নিয়ে চিদম্বরম এবং থারুরের বক্তব্যকে তাই শুধুমাত্র কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য হিসেবে দেখলে বিতর্কটির আসল গুরুত্ব কিছুটা আড়ালে থেকে যায়। এখানে আসলে উঠে এসেছে একটি বড় প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের সাফল্য মাপার মাপকাঠি কী হবে। বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রভাব বাড়ানো এবং একই সঙ্গে সেই প্রভাবকে দেশের বাস্তব স্বার্থে কাজে লাগানো, দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির BRICS সম্মেলন শেষ হওয়ার পর তাই শুধু কতজন রাষ্ট্রপ্রধান এলেন বা কত বড় আয়োজন হল, সেটিই শেষ কথা হবে না। আসল পরীক্ষা হবে, এই কূটনৈতিক উপস্থিতি থেকে ভারত কতটা বাস্তব সহযোগিতা, নতুন সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পারে। সেই ফলাফলই শেষ পর্যন্ত চিদম্বরমের প্রশ্ন এবং থারুরের ‘prestige’ যুক্তি, দুই দিকের বিতর্কের মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠবে।


