সংক্ষিপ্ত সারাংশ: ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু দুই দেশের সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে আস্থার ঘাটতি তৈরি হলেও সহযোগিতার সুযোগ এখনও যথেষ্ট রয়েছে। ভারতের উচিত কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে বাংলাদেশের জনগণ ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে কূটনীতি পরিচালনা করা। রেল যোগাযোগ, জলসম্পদ, বাণিজ্য, শিক্ষা ও জনকূটনীতির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল, আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্বার্থ
সৌরাশীষ ঘোষ: ভারতের পূর্ব সীমান্তে বাংলাদেশের গুরুত্ব কোনও সরকার বা রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল নয়। সরকার বদলাতে পারে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে, কিন্তু ভূগোল বদলায় না। আর সেই ভূগোলই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে পরিণত করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। তার অভিঘাত পড়েছে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের নেপথ্যে বিদেশি শক্তি বা গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা ছিল কি না, সেই বিতর্কে না গিয়েও একটি বিষয় স্পষ্ট-দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি বেড়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশে ভারত-বিরোধী বক্তব্যও আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। তবে সমগ্র বাংলাদেশি সমাজকে ভারত-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ভুল, তেমনই বাংলাদেশের প্রতিটি সমালোচনাকে ভারত-বিরোধিতা হিসেবে দেখাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রকৃত দ্বিপাক্ষিক ক্ষোভ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভুল তথ্য এবং আবেগনির্ভর জাতীয়তাবাদ-সবকিছুকেই বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে।
তবু ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিছক আর পাঁচটি প্রতিবেশী দেশের মতো নয়। চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি স্থলসীমান্ত, আন্তঃসীমান্ত নদী, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এই সম্পর্ককে কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের মূল ভূখণ্ড, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে। ভারতের ‘Neighbourhood First’ ও ‘Act East’ নীতির সাফল্য, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও একটি সহযোগিতামুখী বাংলাদেশ অপরিহার্য।
‘ভারতপন্থী বাংলাদেশ’ নয়
ভারতের লক্ষ্য কখনওই একটি ‘ভারতপন্থী বাংলাদেশ’ তৈরি করা হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়, জাতীয় স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে। ভারত সেই পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না, করা উচিতও নয়। ভারতের প্রয়োজন এমন একটি আত্মবিশ্বাসী ও সার্বভৌম বাংলাদেশ, যে ভারতের সঙ্গে মতপার্থক্য রাখলেও ভারতকে একটি স্বাভাবিক প্রতিবেশী ও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে দেখবে-শত্রু হিসেবে নয়।
এই সম্পর্কের একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো ক্ষমতার অসমতা। অর্থনীতি, জনসংখ্যা, সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক পরিসরের বিচারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড় শক্তি। ফলে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে ভারতের প্রভাব নিয়ে স্বাভাবিক সতর্কতা বা আশঙ্কা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে ভারতেরই আরও সংবেদনশীল ও আস্থাভিত্তিক কূটনীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ভারতের শক্তি যেন বাংলাদেশের কাছে আধিপত্যের প্রতীক না হয়ে সহযোগিতার সম্পদ হিসেবে প্রতিভাত হয়—এটাই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। তাই ভারতের বাংলাদেশনীতি কোনও নির্দিষ্ট সরকারের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাবে না।
জনকূটনীতির নতুন পরিসর
কোনও সম্পর্কের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেলে শুধুমাত্র সরকার-থেকে-সরকার (Government to Government) কূটনীতি দিয়ে তা দীর্ঘস্থায়ীভাবে পুনর্গঠন করা কঠিন। তাই ভারতের উচিত জনকূটনীতির (Public Diplomacy) তথা ট্রাক-২ ডিপ্লোম্যাসির উপর নতুন করে জোর দেওয়া।
এই ক্ষেত্রে দুই বাংলার ভাষা ও সাংস্কৃতিক নৈকট্য ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং অসমের কিছু অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে। এই সম্পর্ককে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে নয়, পারস্পরিক বোঝাপড়ার সেতু হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
বাংলা ভাষার সংবাদমাধ্যমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের কাজ ভারতের সরকারি অবস্থান প্রচার করা নয়; বরং ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও তথ্যনির্ভর, বহুমাত্রিক ও মানবিকভাবে তুলে ধরা। বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতের অর্থনৈতিক পরিবর্তন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক বৈচিত্র্যের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পৌঁছানো দরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তব উদ্বেগ ও মতামতও ভারতীয় সমাজের সামনে তুলে ধরতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর কিছু উদ্যোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমেও তাঁর কয়েকটি উদ্যোগ ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হয়েছে। প্রায় দুই বছর পর এই পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়া মানুষে-মানুষে যোগাযোগ পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে ত্রিবেদীর কিছু মানবিক উদ্যোগ এবং দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। ভিসা পরিষেবাকে আরও সহজ ও মানবিক করার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ তাই গুরুত্ব বহন করে। এই ধরনের ছোট কিন্তু দৃশ্যমান উদ্যোগের গুরুত্ব অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। বিদেশনীতি শুধু বড় চুক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠকে তৈরি হয় না; কখনও কখনও একজন সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাও একটি দেশের সম্পর্কে তার ধারণাকে প্রভাবিত করে।
কলকাতা-ঢাকা: কূটনীতির আরেকটি সেতু
এই কাজে পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা অনন্য হতে পারে। কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বিশ্ববিদ্যালয়, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, ব্যবসায়িক সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্র ও গবেষক বিনিময়, যৌথ সাংস্কৃতিক উৎসব, ব্যবসায়িক সম্মেলন, সাংবাদিক বিনিময়, চিকিৎসা ও শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং পৌর পর্যায়ের অংশীদারিত্ব দুই দেশের সামাজিক দূরত্ব কমাতে পারে।
জাতীয় সরকারের পাশাপাশি রাজ্য ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানও যদি এই সম্পর্ক তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে কলকাতা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে উঠতে পারে। এটি এক ধরনের Paradiplomacy অর্থাৎ জাতীয় সরকারের পাশাপাশি রাজ্য ও স্থানীয় স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করা।
রেলপথ হোক নতুন ‘রেল কূটনীতি’
২০২৪ সালের পর যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগসহ মানুষের চলাচলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছিল, তা দুই দেশের সম্পর্কের সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর উদ্যোগ এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। ভারতের উচিত পুরনো রেল পরিষেবা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি একটি নতুন ধরনের ‘রেল কূটনীতি’র কথা ভাবা।
বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডরগুলির আধুনিকীকরণ, বিদ্যুতায়ন, সিগন্যালিং, রেল নিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ভারত তার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ভাগ করে নিতে পারে। তবে এটিকে বাংলাদেশের উপর ভারতের কোনও ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত একটি যৌথ ভারত-বাংলাদেশ যোগাযোগ উদ্যোগ-যেখানে বাংলাদেশের মালিকানা, সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার ও জাতীয় অগ্রাধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
আধুনিক রেল যোগাযোগ শুধু যাত্রী পরিবহণ সহজ করবে না; বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল ও বন্দরগুলির সঙ্গে ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজারের সংযোগও বাড়াবে। ভবিষ্যতে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী আন্তঃসীমান্ত রেল পরিষেবা আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। রাজনৈতিক বয়ানের প্রতিযোগিতায় যখন সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে, তখন মানুষ, বাজার ও অর্থনীতিকে সংযুক্ত করা একটি আধুনিক রেলপথ অনেক সময় কূটনৈতিক বক্তব্যের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
জল কূটনীতির নতুন কাঠামো
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে জলসম্পদ। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও চুক্তির নবীকরণকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রশ্নটি বাংলাদেশে শুধু পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় আবেগ ও রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ফলে চুক্তির নবীকরণকে কেবল পুরনো কাঠামোর পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখলে চলবে না।
দুই দেশের উচিত একটি বৃহত্তর সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার দিকে এগোনো। বাস্তব সময়ের জলপ্রবাহের তথ্য বিনিময়, বন্যার পূর্বাভাস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কৃষি, নদী-পরিবেশ এবং নদীর স্বাস্থ্য,সবকিছুকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনা দরকার।
তিস্তা সমস্যাতেও একই ধরনের কূটনৈতিক সৃজনশীলতা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে চূড়ান্ত সমাধানের অভাব বাংলাদেশের কাছে ভারতের সদিচ্ছাকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করতে না-পারার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর সমাধানে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থকে উপেক্ষা করা যাবে না। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে আন্তঃসীমান্ত জল কূটনীতি দীর্ঘস্থায়ী করতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় অপরিহার্য।
সরকার বদলাবে, কৌশল বদলানো উচিত নয়
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভুলগুলির একটি হতে পারে কোনও নির্দিষ্ট বাংলাদেশি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের বিকল্প হিসেবে দেখা।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যও দুই দেশের বর্তমান সরকারের সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, আবার ভারতও জানিয়েছে যে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি তার নিজস্ব আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে কোনও এক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করে দেখার ঝুঁকি কতটা বেশি। কোনও একটি রাজনৈতিক শক্তির ওপর ভারতের বাংলাদেশনীতি নির্ভর করা উচিত নয়।
বরং ভারতের প্রয়োজন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি বাংলাদেশনীতি, যা সরকার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থাকবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বাস্তব সুযোগ এখনও রয়েছে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় তার নিজস্ব ইতিহাস, বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ভারত সেই পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না, করা উচিতও নয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতি, ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখনও দুই দেশের মানুষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে থাকতে পারে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে। জল নিয়ে বিরোধ থাকবে, বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা থাকবে, সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগ থাকবে, রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্যও থাকবে। একটি পরিণত সম্পর্কের অর্থ মতপার্থক্যহীন সম্পর্ক নয়; বরং মতপার্থক্য সত্ত্বেও সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা।
ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় এমন একটি বাংলাদেশ, যে দিল্লির প্রতিটি নীতির সঙ্গে একমত হবে। ভারতের প্রয়োজন এমন একটি বাংলাদেশ, যে নিজের জাতীয় স্বার্থে আত্মবিশ্বাসী, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, কিন্তু ভারতকে প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসেবে দেখে না। কারণ ভূগোল দুই দেশকে প্রতিবেশী করেছে; এখন কূটনীতির কাজ সেই প্রতিবেশকে অংশীদারিত্বে পরিণত করা।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো এর অসমতা (asymmetry)। অর্থনীতি, জনসংখ্যা, সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক পরিসরের বিচারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড় শক্তি। ফলে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে ভারতের প্রভাব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সতর্কতা বা আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এই অসমতাকে অস্বীকার না করে ভারতকেই আরও সংবেদনশীল ও আস্থাভিত্তিক কূটনীতি গ্রহণ করতে হবে। ভারতের পূর্ব সীমান্তে আর একটি ‘ভ্রাতৃশত্রু’ রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন এক প্রতিবেশী, যে নিজের স্বার্থেই ভারতের সঙ্গে সহযোগিতাকে বেছে নেবে।


