সংক্ষিপ্ত সার: আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন মহাকাশে আধিপত্য দেখানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই সদ্য স্বাধীন, দারিদ্র্যে জর্জরিত ভারত নিজের মতো করে মহাকাশে পা রাখার স্বপ্ন দেখেছিল। তবে সেই স্বপ্নের লক্ষ্য ছিল একেবারে আলাদা, প্রতিপত্তি নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন বদলানো। কেরলের এক গির্জা থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রার গল্পই আজকের প্রতিবেদনে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বিশ্ব রাজনীতির রং বদলে যায় সম্পূর্ণ। যুদ্ধের বদলে শুরু হয় ঠান্ডা লড়াই, আর তার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল মহাকাশ দখলের প্রতিযোগিতা। আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরকে টেক্কা দিতে ব্যস্ত ছিল রকেট আর উপগ্রহ নিয়ে। ঠিক সেই সময়েই, ১৯৪৭ সালে জন্ম নেয় স্বাধীন ভারত, বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশ নিয়ে গঠিত এক নতুন দেশ, যার হাতে তখন খাদ্য আর শিক্ষার মতো মৌলিক সমস্যাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এমন অবস্থাতেও ভারত মহাকাশের দিকে তাকিয়েছিল, তবে সেই লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
যে দর্শন নিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন মহাকাশে আধিপত্য দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, ঠিক তখনই সদ্য স্বাধীন, দরিদ্র ভারত মহাকাশে পা রাখার স্বপ্ন দেখেছিল সম্পূর্ণ আলাদা কারণে। বিক্রম সারাভাই স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ধনী দেশগুলির সঙ্গে চাঁদ বা গ্রহ জয়ের প্রতিযোগিতায় নামার কোনও পরিকল্পনা ভারতের নেই। বরং উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে মানুষ আর সমাজের বাস্তব সমস্যা সমাধানে। এই একটা বাক্যেই আসলে লুকিয়ে আছে ইসরোর গোটা প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শন। মহাকাশ প্রতিপত্তির বিষয় নয়, এটা উন্নয়নের হাতিয়ার।
এই দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে যে দৃশ্যগুলো তৈরি হয়েছিল, তা প্রায় রূপকথার মতো শোনায় আজকের দিনে দাঁড়িয়ে। কেরলের থুম্বায় একটা গির্জাকে বানানো হয়েছিল গবেষণাগার, বিশপের বাড়ি হয়ে উঠেছিল কর্মশালা। রকেটের যন্ত্রাংশ যেত সাইকেলে চাপিয়ে, উপগ্রহের সরঞ্জাম বওয়া হত গোরুর গাড়িতে। অথচ এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই তৈরি হয়েছিল এমন একটা প্রতিষ্ঠান, যা আজ বিশ্বের অন্যতম সফল মহাকাশ সংস্থা।

দুই স্বপ্নদ্রষ্টা
এই যাত্রার মূল কারিগর হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখা আছে দুজনের, বিক্রম সারাভাই এবং হোমি ভাভা। পরমাণু বিজ্ঞানে ভারতের ভিত গড়ে তোলা ভাভা যেমন উচ্চস্তরে রাজনৈতিক সমর্থন জোগাড় করার কাজটা করেছিলেন, তেমনই সারাভাই হয়ে উঠেছিলেন প্রতিষ্ঠান গড়ার মূল স্থপতি। সদ্য স্বাধীন, সম্পদে সীমিত একটা দেশে বড় মাপের বিজ্ঞান প্রকল্প শুরু করার সাহস তাঁরাই দেখিয়েছিলেন।
গির্জা যখন গবেষণাগার, সাইকেলে চড়ে রকেট
ভারতের প্রথম রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল কেরলের থুম্বায়, বিষুবরেখার কাছাকাছি একটা ছোট্ট মৎস্যজীবী গ্রামে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই জায়গা আয়নোস্ফিয়ার নিয়ে গবেষণার জন্য আদর্শ বলে বেছে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন হাতে ছিল না পর্যাপ্ত পরিকাঠামো। স্থানীয় সেন্ট মেরি ম্যাগডালিন গির্জাকেই বানানো হয় গবেষণাগার, আর বিশপের বাসভবন হয়ে ওঠে কর্মশালা। রকেটের যন্ত্রাংশ বহন করা হত সাইকেলে চাপিয়ে, আর উপগ্রহের সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হত গোরুর গাড়িতে। ১৯৬৩ সালের ২১ নভেম্বর এই থুম্বা থেকেই উৎক্ষেপণ হয় ভারতের প্রথম সাউন্ডিং রকেট।
টেলিভিশনকে শিক্ষক বানানোর ভাবনা
পশ্চিমী দুনিয়ায় টেলিভিশনকে অনেক সময় নিছক বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হলেও, ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি তাকে ব্যবহার করেছিল সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। ১৯৭৫ থেকে ৭৬ সালের মধ্যে চালানো স্যাটেলাইট ইনস্ট্রাকশনাল টেলিভিশন এক্সপেরিমেন্ট বা SITE কর্মসূচিতে NASA র একটি উপগ্রহ ব্যবহার করে দেশের ছয়টি রাজ্যের প্রায় আড়াই হাজার গ্রামে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হয় শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, কৃষি সংক্রান্ত পরামর্শ। রাস্তা বা স্কুলের অভাব থাকা সত্ত্বেও উপগ্রহ প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি প্রত্যন্ত গ্রামে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার এই পরীক্ষা সেই সময়ের নিরিখে ছিল একেবারেই অভিনব।
আর্যভট্ট এবং কালামের গল্প
১৯৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল সোভিয়েত ইউনিয়নের রকেটে চেপে মহাকাশে পাড়ি দেয় ভারতের প্রথম উপগ্রহ আর্যভট্ট, যার নাম রাখা হয়েছিল প্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্টের নামে। এরপর ভারত নিজস্ব রকেটে নিজের উপগ্রহ পাঠানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু করে, যার প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তরুণ বিজ্ঞানী এ পি জে আব্দুল কালাম। এই SLV-3 রকেট তৈরির সময়কার নেতৃত্বের প্রতি ভরসার একটা কিংবদন্তিতুল্য গল্প আজও ইসরোর অন্দরে প্রচলিত, তরুণ কালামের উপর আস্থা রেখে তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানের প্রবীণ নেতৃত্ব। পরবর্তীকালে এই কালামই পরিচিত হন ভারতের মিসাইল ম্যান নামে, এবং একদিন হয়ে ওঠেন দেশের রাষ্ট্রপতিও।
এখন প্রশ্ন উঠছে কেন
ঠিক এই জায়গা থেকেই আজকের প্রেক্ষাপটে ফিরে আসা দরকার। গত কয়েক সপ্তাহে ইসরোর কর্মী সংগঠনগুলি সংস্থার চেয়ারম্যানকে চিঠি লিখে জানতে চেয়েছে, রকেট তৈরির মূল কাজ যদি পুরোপুরি বেসরকারি সংস্থার হাতে চলে যায়, তাহলে ইসরোর নিজস্ব ভূমিকা কী দাঁড়াবে। তাঁদের আশঙ্কা, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমশ কমে গেলে কর্মসংস্থান কমবে, নতুন নিয়োগ কমবে, এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন সেই মূল দক্ষতাই একদিন হারিয়ে যেতে পারে।
আমার ব্যক্তিগত মত হল, এই প্রশ্নটা ফেলনা নয়। ইসরো যে দর্শনের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছিল, সেখানে প্রতিষ্ঠানটাই ছিল দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার প্রতীক। রকেট তৈরির মতো মূল দক্ষতা যদি পুরোপুরি বেসরকারি সংস্থার হাতে চলে যায় এবং সরকারি সংস্থা শুধু গবেষণার একটা ছোট শাখায় পরিণত হয়ে যায়, তাহলে সেই স্বনির্ভরতার ধারণাটাই কি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে না?
অন্য দিকটাও অস্বীকার করা যায় না
তবে এই তর্কের অন্য পিঠটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি সংস্থাগুলিকে যুক্ত করার পিছনে যুক্তিও একেবারে ফেলনা নয়। নিয়মিত রকেট তৈরির মতো কাজ শিল্পক্ষেত্রে ছেড়ে দিয়ে ইসরো নিজে যদি আরও জটিল গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি আর উচ্চাভিলাষী অভিযানে মনোনিবেশ করতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের মহাকাশ ক্ষমতাকেই আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশ্বের অন্য বহু মহাকাশ কর্মসূচিতেও সরকারি গবেষণা সংস্থা আর বেসরকারি উৎপাদন সংস্থা পাশাপাশি কাজ করে সাফল্য পেয়েছে। সমস্যাটা তাই বেসরকারিকরণ নিজে নয়, বরং সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং পরিকল্পনার অভাব।
কী হওয়া উচিত বলে মনে করি
আমার মনে হয়, বিতর্কটাকে সাদা কালোয় ভাগ করে ফেলাটা ভুল হবে। প্রশ্নটা এই নয় যে বেসরকারি সংস্থা আসা উচিত কি উচিত নয়, প্রশ্নটা হল, এই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় ইসরোর প্রতিষ্ঠাকালীন সেই মূল দর্শনটা, অর্থাৎ প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কাজে লাগবে, প্রতিষ্ঠানটা দেশের নিজস্ব ক্ষমতার প্রতীক হয়েই থাকবে, এই ভাবনাটা ধরে রাখা যাচ্ছে কিনা। কর্মী সংগঠনগুলির দাবি যে লিখিত এবং স্বচ্ছ নীতি চাই, সেটা আসলে যুক্তিসঙ্গত একটা চাহিদা। কোনও প্রতিষ্ঠান যখন নিজের প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন থেকে অনেকটা দূরে সরে যাওয়ার মতো একটা বদলের মুখে দাঁড়ায়, তখন সেই বদল নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক, গোপনে বা ধাপে ধাপে না জানিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়।
উপসংহার
সাইকেলে চাপিয়ে রকেট নিয়ে যাওয়া সেই দিন থেকে জিওসিনক্রোনাস কক্ষে উপগ্রহ পাঠানো আজকের ইসরো, দূরত্বটা বিশাল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটা যে মূল্যবোধ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, প্রযুক্তি হবে মানুষের সেবায়, প্রতিষ্ঠানটা হবে দেশের নিজস্ব ক্ষমতার প্রতীক, সেই মূল্যবোধটাকে আজকের বদলের মধ্যেও বাঁচিয়ে রাখা দরকার বলেই মনে করি। বেসরকারি অংশগ্রহণ আসুক, তাতে আপত্তির কিছু নেই, কিন্তু সেই পথ চলার সময় ইসরো যেন তার নিজের আসল গল্পটা ভুলে না যায়, এই আশাটুকু অন্তত রাখাই যায়।


