সংক্ষিপ্ত সার: রকেট তৈরির প্রযুক্তি ধাপে ধাপে বেসরকারি হাতে চলে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরোর কর্মী সংগঠনগুলি। সংস্থার চেয়ারম্যান তথা দেশের মহাকাশ দফতরের সচিব ভি নারায়ণনকে চিঠি লিখে তারা জানতে চেয়েছে, এই নীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান ঠিক কী, এবং ভবিষ্যতে ইসরোর ভূমিকা কতটা থাকবে। সংবাদমাধ্যম WION এর একটি প্রতিবেদনে এই চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে এসেছে।
নিজস্ব সংবাদদাতা: GSLV F17 রকেটের হাত ধরে EOS 05 উপগ্রহের সফল উৎক্ষেপণের রেশ কাটতে না কাটতেই ইসরোর অন্দরে সামনে এল অন্য একটা উদ্বেগের ছবি। সংস্থার ন’টি কর্মী সংগঠন যৌথভাবে চিঠি লিখেছে ইসরো চেয়ারম্যান তথা মহাকাশ দফতরের সচিব ভি নারায়ণনকে। বিষয়, রকেট তৈরির মতো মূল কাজকর্ম ক্রমশ বেসরকারি সংস্থার হাতে চলে যাওয়া নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি কী, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া। সংবাদমাধ্যম WION এই পাঁচ পাতার চিঠি হাতে পাওয়ার দাবি করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখান থেকেই এই তথ্য জানা যাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত কোথায়
গত ২১ অগস্ট বিজনেস টুডের এক অনুষ্ঠানে ইন স্পেসের চেয়ারম্যান পবন গোয়েন্কা মন্তব্য করেছিলেন, ভবিষ্যতে ইসরো নিজে আর কোনও রকেট তৈরি করবে না, সেই কাজ পুরোপুরি বেসরকারি সংস্থা বা সরকারি সংস্থার হাতে চলে যাবে। এই মন্তব্যকেই তাদের চিঠিতে উদ্ধৃত করেছে কর্মী সংগঠনগুলি, এবং জানতে চেয়েছে এটা কি সরকার, স্পেস কমিশন বা মহাকাশ দফতরের অনুমোদিত কোনও সিদ্ধান্ত, নাকি নিছক একটা মন্তব্য।
কারা সই করেছে এই চিঠিতে
WION এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিঠিতে সই করেছে ইসরো স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন, SHAR এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন, ISAC এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন সহ মোট ন’টি সংগঠন, যারা VSSC, SDSC, URSC, LPSC, SAC, NRSC এবং IPRC এর মতো ইসরোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের কর্মীদের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সংগঠনগুলি মিলিয়ে প্রতিনিধিত্ব করে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর, যা ইসরোর মোট আঠারো হাজার একশো জন কর্মীর প্রায় সাতাশ শতাংশ।
চিঠিতে ঠিক কী চাওয়া হয়েছে
চিঠিতে মূলত তিনটি বিষয়ে স্পষ্টতা চাওয়া হয়েছে। প্রথমত, ভবিষ্যতে PSLV, LVM3, SSLV এর মতো রকেটের নকশা তৈরি, বাস্তবায়ন, সংযোজন, পরীক্ষা এবং উৎক্ষেপণের কাজ ইসরো নিজে চালিয়ে যাবে কিনা, নাকি তা বন্ধ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, PSLV এবং LVM3 এর উৎপাদন সরকারি সংস্থাগুলিকে বাদ দিয়ে সরাসরি বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা, হলে তার কারণ কী। তৃতীয়ত, এই ধরনের প্রযুক্তি হস্তান্তরে NSIL এবং IN SPACe এর ভূমিকা ঠিক কী, তা নিয়েও লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, “ইসরো তৈরি হয়েছে সরকারি অর্থে, সরকারি উদ্দেশ্যে এবং সরকারি কর্মীবাহিনী দিয়ে। রকেটের নকশা তৈরি, বাস্তবায়ন, সংযোজন, পরীক্ষা এবং উৎক্ষেপণ নিছক উৎপাদনের কাজ নয়, এটাই সংস্থার মূল দক্ষতা এবং কৌশলগত ক্ষমতা।”
ইতিমধ্যেই কী কী পরিবর্তন হয়েছে
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ছোট রকেট SSLV এর প্রযুক্তি ও উৎপাদনের অধিকার ইতিমধ্যেই দরপত্রের মাধ্যমে হিন্দুস্তান এরোনটিক্স লিমিটেডকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় রকেট LVM3 এবং নিয়মিত ব্যবহৃত PSLV এর প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও চলছে বলে দাবি করা হয়েছে চিঠিতে। তামিলনাড়ুর কুলশেখরপত্তনমের নতুন লঞ্চ কমপ্লেক্স বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে দেওয়ার কথাও উল্লেখ আছে। কর্মী সংগঠনগুলির অভিযোগ, এই ধরনের সিদ্ধান্তের কোনওটাই নিয়ে দফতরের তরফে সরাসরি কর্মীদের কিছু জানানো হয়নি।
জনবল নিয়ে উদ্বেগ কেন
চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইসরো ক্রমশ রকেট এবং উপগ্রহ তৈরির কাজ থেকে সরে এলে বর্তমান কর্মীরা কাজ হারাতে পারেন, অথবা তাঁদের অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হতে পারে, এমনকি একই কাজ বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে করানো হতে পারে সরকারি প্রযুক্তি ব্যবহার করেই। নতুন নিয়োগও কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে চিঠিতে।
এই আশঙ্কার একটা প্রেক্ষাপটও আছে। সংসদে পেশ হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসেবে ইসরোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে অনুমোদিত পদ ছিল ১৪ হাজার ১০৮টি, তার মধ্যে কর্মরত ছিলেন ১২ হাজার ৪৭২ জন, অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ পদ ফাঁকা। প্রশাসনিক বিভাগে অনুমোদিত ৪ হাজার ৩৪টি পদের মধ্যে কর্মরত ছিলেন মাত্র ৩ হাজার ৫৭ জন, অর্থাৎ ফাঁকা পদের হার প্রায় ২৪ শতাংশ। সরকার সংসদে জানিয়েছিল, এই শূন্যপদ পূরণের চেষ্টা চলছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
WION এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে ইসরো চেয়ারম্যান ভি নারায়ণনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
চিঠির সুর কেমন
তবে চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, তারা বেসরকারি সংস্থার বিরোধী নয়, এবং ইসরোর বাণিজ্যিক শাখা NSIL এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাঠামোয় বাণিজ্যিকীকরণেও তাদের আপত্তি নেই। তাদের বক্তব্য, সমস্যাটা হল, বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানো আর ইসরোর নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার মধ্যে স্পষ্ট কোনও সরকারি নীতি নথি এখনও নেই। চিঠির শেষে তারা লিখেছে, তারা এই আবেদন জানাচ্ছে গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক মনোভাব থেকেই, এবং একই সঙ্গে GSLV F17 ও EOS 05 মিশনের সাফল্যের জন্য ইসরোকে অভিনন্দনও জানিয়েছে।
একই সপ্তাহে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
এই চিঠি সামনে আসার মধ্যেই ৫ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ুর মহেন্দ্রগিরিতে ইসরোর প্রপালশন রিসার্চ কমপ্লেক্সে সেমি ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। প্রথমবার সম্পূর্ণ ২০০ টন থ্রাস্টে এই ইঞ্জিনের পাওয়ার হেড পরীক্ষা করা হয়, যা ভবিষ্যতে LVM3 রকেটের ক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার হবে। ইসরোর দাবি, পরীক্ষাটি পরিকল্পনামাফিকই সফল হয়েছে।
উপসংহার
একদিকে GSLV F17 এর সাফল্য, অন্যদিকে ভবিষ্যতের নীতি নিয়ে কর্মীদের উদ্বেগ, এই দুইয়ের মধ্যে দিয়েই এখন এগোচ্ছে ইসরো। কর্মী সংগঠনগুলির দাবি স্পষ্ট, বেসরকারি অংশগ্রহণে তাদের আপত্তি নেই, তবে সেই প্রক্রিয়া কতদূর যাবে এবং সরকারি সংস্থা হিসেবে ইসরোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা ঠিক কী থাকবে, তা নিয়ে স্পষ্ট ও লিখিত নীতি চান তাঁরা। সরকারের তরফে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক জবাব আসেনি। আগামী দিনে এই প্রশ্নের উত্তর কীভাবে আসে, তার উপরেই নির্ভর করছে ইসরোর কর্মীদের ভবিষ্যৎ এবং সংস্থার নিজস্ব কাঠামোর দিকনির্দেশ।


