আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপাল তিব্বত সীমান্তে আচমকা হড়পা বানে বিপর্যস্ত রাসুয়া। ভোটেকোশী নদীর জল ও কাদার স্রোতে ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি, গাড়ি এবং সেতু। বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ বহু পর্যটক। তাঁদের মধ্যেই কলকাতা থেকে মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া ৩২ জনের একটি দল রয়েছে। প্রাথমিক ভাবে তুষারধস এবং নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে আচমকা জল নেমে আসাকেই বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রাসুয়ায় সকালটা আচমকাই বদলে গেল
বুধবার সকাল তখন সাড়ে ৮টা পেরিয়েছে। রাসুয়ার মানুষ তখনও দিনের কাজ শুরু করেছেন। সীমান্তের পথে পর্যটক ও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করছিল। হঠাৎই বাড়তে শুরু করল ভোটেকোশী নদীর জল। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই জল আর শুধু নদীর মধ্যে থাকল না। কাদামাটি, পাথর এবং ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে নিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের এলাকায়। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরের রাসুয়া জেলা। পাহাড় ঘেরা এই এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বাস। তিব্বত থেকে নেপালে ঢুকে ভোটেকোশী নদী এই জেলার মধ্য দিয়ে নেমে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা, বিপুল জল তিব্বতের দিক থেকেই নেমে এসেছিল। তিমুর এবং স্যাব্রুবেসী এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি বলে জানা যায়।
প্রশাসনের কাছে একের পর এক খবর আসতে থাকে। কোথাও বাড়ি নেই, কোথাও রাস্তা কেটে গিয়েছে, কোথাও সেতু ভেঙে পড়েছে। নদীর স্রোতে গাড়ি ভেসে যাওয়ার ছবিও সামনে আসে। কতজন নিখোঁজ, সেই হিসাবও তখন পরিষ্কার নয়। প্রথম দিকে নেপাল প্রশাসন ৯৫ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। ২৯১ জন বিদেশি-সহ অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না বলে খবর আসে। নিখোঁজদের মধ্যে ১৪১ জন ভারতীয় ছিলেন। উদ্ধারকাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যাগুলি বদলেছে। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় চূড়ান্ত হিসাব পেতে সময় লাগছে।

কলকাতার ৩২ জনের অপেক্ষায় পরিবার
এই বিপর্যয়ের খবর কলকাতার বেশ কিছু পরিবারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মানস সরোবর যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে যে দলটি নেপালে গিয়েছিল, তাঁদের ৩২ জনের সঙ্গে বুধবার সকাল থেকে যোগাযোগ নেই। দলে ছিলেন ৩০ জন পর্যটক এবং ভ্রমণ সংস্থার দুই কর্মী। ২১ আগস্ট কলকাতা থেকে রওনা দিয়েছিলেন তাঁরা। পরের দিন নেপালে পৌঁছন। মঙ্গলবার পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কাঠমান্ডু থেকে ছবি এবং ভিডিয়োও পাঠিয়েছিলেন দলের সদস্যেরা। বুধবার সকালে সীমান্ত পার হয়ে তিব্বতের দিকে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ দলটি অভিবাসন দফতরের কাছে ছিল। তার পর আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
ভ্রমণ সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর হেলিকপ্টার নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে সেখানে নামা সম্ভব হয়নি। নেপাল ট্যুরিজম এবং দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। তবু তখনও কলকাতার ওই দলটির কোনও নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি। পরিবারগুলির কাছে তাই সময় যেন থমকে রয়েছে। ফোনের ওপারে কোনও পরিচিত গলা শোনা যাবে কি না, সেই অপেক্ষাই এখন সবচেয়ে বড়।
নদী আটকাল কী ভাবে?
হড়পা বানের কারণ নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। প্রাথমিক ভাবে ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, তুষারধসের সঙ্গে নেমে আসা পাথর ও বরফ নদীর গতিপথ আটকে দিয়েছিল। সেই জায়গায় জল জমে যাওয়ার পরে আচমকা বাধ ভেঙে গেলে বিপুল জল একসঙ্গে নেমে আসে। কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের বক্তব্য অনুযায়ী, লেহন্দে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে পরে জমা জল ভোটেকোশীতে নেমে আসতে পারে। কোনও হিমবাহের হ্রদ ভেঙে গিয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল জানিয়েছিলেন, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ একটি ভূমিকম্প হয়েছিল এবং তার পরে তুষারধস নামে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হড়পা বান শুরু হয় বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়। তবে ভূমিকম্প, তুষারধস এবং বন্যার মধ্যে ঠিক কী সম্পর্ক ছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এখানেই তদন্তের আসল প্রশ্ন। পাহাড়ের উপরে কী ঘটেছিল, কতটা বরফ বা পাথর নদীর পথে নেমেছিল এবং কোথায় জল জমেছিল, সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিপর্যয়ের পুরো ছবিটা পরিষ্কার হবে না।
এক বছর আগেও একই নদীতে হড়পা বান
উদ্বেগের কারণ আরও একটি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসেও ভোটেকোশী নদীতে একই ধরনের হড়পা বান হয়েছিল। সেই সময় অনুসন্ধানে রাসুয়া নেপাল চিন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহের হ্রদ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা সামনে এসেছিল। অর্থাৎ এই এলাকার নদী ও হিমবাহের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। এক বছরের মধ্যে একই অঞ্চলে আবার বড় বিপর্যয় ঘটায় স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
১৯৯৮ সালের মালপার কথা মনে পড়ছে
রাসুয়ার ঘটনার সঙ্গে আরও একটি পুরনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ১৯৯৮ সালের আগস্টে উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড়ের মালপা গ্রামে ভয়াবহ ধস নেমেছিল। প্রাণ হারিয়েছিলেন ২২১ জন। তাঁদের মধ্যে ৬০ জন ছিলেন কৈলাস মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী। তখনও তীর্থযাত্রীরা পাহাড়ি দুর্যোগের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন। এত বছর পরে একই তীর্থপথের কাছাকাছি ফের এমন বিপর্যয় ঘটায় পুরনো সেই ঘটনাটির কথা স্বাভাবিক ভাবেই মনে পড়ছে। তবে দু’টি ঘটনাকে একই কারণে ঘটেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। হিমালয়ের প্রতিটি বিপর্যয়ের পিছনে স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।
ভারত দ্রুত সাহায্যে এগিয়ে এল
নেপালের বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। ভারত নেপালের পাশে থাকার বার্তা দেয়। আটকে পড়া ভারতীয়দের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থাও করা হয়। এর পর নেপালে ১০ টন ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাঠানো হয়। C130J বিমান করে অস্থায়ী আশ্রয়, কম্বল, স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী, সৌর আলো এবং ওষুধ পাঠানো হয়। আরও ত্রাণ নিয়ে C17 বিমান পাঠানোর প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছিল। কলকাতার নিখোঁজ পর্যটকদের বিষয়টিও রাজ্যের নজরে আসে। নেপাল প্রশাসন এবং কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাঁদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। পরিবারের সদস্যদের জন্য রাজ্য ও কলকাতা পুলিশের তরফেও হেল্পলাইন চালু করা হয়।
নেপালের পর নজর ভারতের নদীগুলিতেও
বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। নেপাল থেকে নেমে আসা একাধিক নদী ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশের দিকে যায়। ফলে নেপালের জলপ্রবাহের পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। বিহারের পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, সারণ, মুজফ্ফরপুর এবং বৈশালীর মতো জেলাগুলিতে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। NDRF এর দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ভারত নেপাল সীমান্তে SSB এর rescue and relief teams কেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শুধু জলবায়ু পরিবর্তন বললেই উত্তর মিলবে না
হিমালয়ে একের পর এক হড়পা বান এবং হিমবাহ সম্পর্কিত বিপর্যয়ের পরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ সামনে আসাটাই স্বাভাবিক। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। গবেষণায় বলা হয়েছিল, ২০০০ সালের পর হিমবাহ গলার গতি আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। কিন্তু রাসুয়ার এই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা এখনও ঠিক হবে না। তুষারধস, ভূমিধস, হিমবাহের হ্রদ, ভূকম্পন এবং নদীর গতিপথের পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করতে পারে। কোন কারণটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নির্ধারণ করতে আরও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সীমান্তের রেখা থামাতে পারেনি বিপর্যয়
তিব্বতের জিরং সীমান্তবন্দরেও এই বানের প্রভাব পড়েছে। কাদার স্রোতে বাড়িঘর ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এসেছে। উদ্ধারকাজ শুরু করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে চিনা সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে। এই জায়গাতেই ভারত, নেপাল এবং চিনের মধ্যে আরও দ্রুত তথ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। পাহাড়ে কোনও হিমবাহের হ্রদ ভাঙলে বা নদীর গতিপথ আটকে গেলে তার খবর সীমান্ত পার হতে হয় দ্রুত। কয়েক ঘণ্টা পরে পাওয়া তথ্য অনেক সময় আর কাজে আসে না।
আগামী দিনের জন্য শিক্ষা
রাসুয়ার ঘটনা দেখিয়েছে, পাহাড়ে বিপদের সময় হাতে সময় থাকে খুব কম। তাই শুধু বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়ে হিমালয়ের হড়পা বান ঠেকানো সম্ভব নয়। হিমবাহ, হিমবাহের হ্রদ, তুষারধস এবং নদীর গতিপথের উপরও নজর রাখতে হবে। প্রযুক্তি এখানে বড় ভূমিকা নিতে পারে। উপগ্রহের ছবি, নদীর জল মাপার যন্ত্র, আবহাওয়া কেন্দ্র, ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের দ্রুত সতর্কবার্তা, সবকিছুকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনা দরকার। আর তার সঙ্গে প্রয়োজন সীমান্তের দুই প্রান্তের প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ।
শেষ কথা
রাসুয়ার হড়পা বান এখনও শেষ কথা বলেনি। উদ্ধারকাজ চলছে। নিখোঁজদের তালিকা বদলাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও কারও সন্ধান মিলতে পারে, আবার কোনও পরিবারের অপেক্ষারও শেষ হতে পারে দুঃসংবাদে। কলকাতা থেকে মানস সরোবরের পথে যাওয়া ৩২ জনের পরিবারগুলি এখন সেই অপেক্ষার মধ্যেই রয়েছে। কয়েক দিন আগেও যাঁরা পাহাড়ের ছবি পাঠাচ্ছিলেন, তাঁদের ফোন এখন নীরব। এই নীরবতাই হয়তো রাসুয়ার বিপর্যয়ের সবচেয়ে মানবিক ছবি। হিমালয়ের ভূপ্রকৃতি বদলাচ্ছে কি না, তার উত্তর বিজ্ঞানীরা খুঁজবেন। নদীর গতিপথ কেন বদলাল, তাও তদন্তে জানা যাবে। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি অপেক্ষা করতে পারে না।


