সংক্ষিপ্তসার: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলির সুযোগ তৈরি করা সংশোধনী বিল। সরকারের বক্তব্য, নতুন ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও কর্মীদের পাঠিয়ে শিক্ষার মান, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তবে শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশের আশঙ্কা, এই আইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন ও শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কলকাতা ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তনের দরজা খুলে গেল। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিধানসভায় পাশ হল West Bengal Universities and Colleges (Administration and Regulation) Amendment Bill, 2026। এই সংশোধনের ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী এক রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মীদের বদলি করার আইনি সুযোগ তৈরি হল। বিলটি ২০১৭ সালের আইনের Section 14A তে নতুন বিধান যুক্ত করছে।
কী রয়েছে নতুন বিলে?
নতুন ব্যবস্থায় প্রশাসনিক প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিধানে চ্যান্সেলর রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে এই বদলির সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। বদলির ক্ষেত্রে কর্মীর চাকরির শর্ত এবং সার্ভিস সংক্রান্ত বিষয়গুলি নির্দিষ্ট আদেশ অনুযায়ী বহাল থাকবে। সরকারের তরফে আরও জানানো হয়েছে, বদলির ফলে কর্মীর সার্ভিস সিনিয়রিটি বজায় থাকবে এবং বদলির খরচ রাজ্য সরকার বহন করবে।
সরকারের যুক্তি কী?
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সাহায্যে দ্রুত শক্তিশালী করে তোলা। তাঁর দাবি, অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে তাঁরা পরিকাঠামো তৈরি, ক্লাস পরিচালনা এবং প্রতিষ্ঠানকে Centre of Excellence হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবেন। ঝাড়গ্রাম এবং কোচবিহারের মতো জায়গায় গড়ে ওঠা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদের আদানপ্রদানের কথাও তিনি বলেছেন।
‘তথাকথিত পণ্ডিত’ মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক
বিধানসভায় বিল নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষাবিদকে কটাক্ষ করে ‘তথাকথিত পণ্ডিত’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, যাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে, তাঁদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার করা উচিত। তিনি এমনও বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করার জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং কর্মীদের সেখানে পাঠানো হবে। তবে এই বক্তব্যের রাজনৈতিক দিক নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। কারণ, এই বিল নিয়ে বিতর্কটি শুধু শিক্ষক বদলির প্রশাসনিক প্রয়োজনেই সীমাবদ্ধ নেই। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিবেশকে ঘিরে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের সঙ্গেও বিষয়টি একই সময়ে সামনে এসেছে। ফলে বিরোধীদের একাংশ এবং শিক্ষকমহলের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বদলির ক্ষমতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতে পারে।

শিক্ষক সংগঠনগুলির আপত্তি কোথায়?
শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশ এই সংশোধনীকে স্বাগত জানায়নি। তাদের প্রধান প্রশ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন, চাকরির শর্ত এবং বদলির ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তা নিয়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং অন্যান্য শিক্ষকমহলের প্রতিনিধিরা জানতে চেয়েছেন, পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন ও সার্ভিস রুলের সঙ্গে নতুন বদলি ব্যবস্থার সমন্বয় কীভাবে হবে। তাঁদের আশঙ্কা, স্পষ্ট নীতিমালা ও যথাযথ আলোচনা ছাড়া এই ক্ষমতা প্রয়োগ হলে শিক্ষকদের উপর প্রশাসনিক চাপ তৈরি হতে পারে।
শুধু শিক্ষক নয়, অশিক্ষক কর্মীরাও আওতায়
এই সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শুধু অধ্যাপক বা শিক্ষক নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অশিক্ষক কর্মীরাও এর আওতায় থাকবেন। সরকারের যুক্তি অনুযায়ী, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শুধু শিক্ষক নয়, লাইব্রেরি, গবেষণাগার, প্রশাসন এবং অন্যান্য পরিষেবা চালু করার জন্য দক্ষ কর্মীরও প্রয়োজন। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী মানবসম্পদকে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সংস্কার নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসনে হস্তক্ষেপ?
এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। সরকারের দৃষ্টিতে এটি মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে দ্রুত শক্তিশালী করার একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। অন্যদিকে শিক্ষক সংগঠনগুলির আশঙ্কা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিয়োগ ব্যবস্থা এবং স্বশাসনের কাঠামোর উপর এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে একই বিলকে সরকার দেখছে দক্ষতা ও সমতা আনার হাতিয়ার হিসেবে, আর শিক্ষকমহলের একাংশ দেখছে সম্ভাব্য প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের নতুন পথ হিসেবে।
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এই সংশোধনী নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও দক্ষ কর্মীদের পাঠানো গেলে পরিকাঠামো এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে বদলির প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা যায় তার উপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি শিক্ষকদের অধিকার, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বশাসন বজায় রাখা। তাই এখন নজর থাকবে এই নতুন আইনের বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হয় এবং পুরনো ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মানবসম্পদের এই নতুন বিন্যাস শেষ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।


