কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক: আগস্ট মাসে দেশের পণ্য ও পরিষেবা কর অর্থাৎ GST বাবদ আদায় হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের আগস্টের তুলনায় এই আদায় বেড়েছে ১৪.৮ শতাংশ। তবে সেই বৃদ্ধির পুরো সুফল সরকারের কোষাগারে পৌঁছয়নি। কারণ একই সময়ে রিফান্ড বাবদ ফেরত দিতে হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬৮ শতাংশ বেশি। অর্থ মন্ত্রকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানেই উঠে এসেছে এই তথ্য।
গত বছর আগস্টে GST আদায় হয়েছিল ১ লক্ষ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় এবারের বৃদ্ধির হার ভালো হলেও, জুলাইয়ের তুলনায় এই সংখ্যাটা কিছুটা কম। জুলাইয়ে GST আদায় দ্বিতীয়বারের জন্য দুই লক্ষ কোটি টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছেছিল ২ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকায়।
কোথা থেকে এল এই বৃদ্ধি
আদায়ের অঙ্কটাকে ভেঙে দেখলে বোঝা যায়, দেশের ভিতরের ব্যবসা থেকে আসা রাজস্ব এবং আমদানির উপর বসানো করের মধ্যে বেশ ফারাক তৈরি হয়েছে।
দেশের ভিতরে অর্থাৎ ঘরোয়া GST আদায় বেড়েছে ৯.৩ শতাংশ, গত বছরের ১ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে আমদানির উপর বসানো GST বেড়েছে অনেক বেশি হারে, প্রায় ২৯ শতাংশ। গত বছরের ৪৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে তা দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ সার্বিক বৃদ্ধির পিছনে আমদানি থেকে আসা করের অবদান অনেকটাই বেশি। এই ফারাকটাই কর বিশেষজ্ঞদের একাংশের নজর কেড়েছে, কারণ ঘরোয়া উৎপাদন যতটা গতিতে বাড়ছে, তার তুলনায় আমদানি নির্ভরতা কিছুটা বেশি বলে মনে করছেন তাঁরা।
কেন এত বাড়ল রিফান্ড
আগস্ট মাসের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হল রিফান্ডের অঙ্কে। মোট রিফান্ড বেড়েছে প্রায় ৬৮ শতাংশ, যা গিয়ে ঠেকেছে ৩১ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকায়।
এর মধ্যে ঘরোয়া ব্যবসার ক্ষেত্রে রিফান্ড বেড়েছে ৭২.৬ শতাংশ, অঙ্কের হিসেবে ১৮ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। আর রফতানি সংক্রান্ত রিফান্ড, যা ICEGATE পোর্টালের মাধ্যমে প্রক্রিয়া হয়, তা বেড়েছে ৬১.৮ শতাংশ, অর্থাৎ ১৩ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা।
ঘরোয়া রিফান্ডের এই বৃদ্ধির পিছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে ইনভার্টেড ডিউটি স্ট্রাকচার নামে একটা পরিচিত সমস্যা। সহজ ভাষায় বললে, কোনও ব্যবসায় কাঁচামালের উপর যত কর দিতে হয়, তৈরি পণ্যের উপর তার চেয়ে কম কর বসলে এই সমস্যা তৈরি হয়। ফলে ব্যবসায়ীর হাতে জমতে থাকে ব্যবহার না হওয়া ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট, যা ফেরত পেতে তাঁদের সরকারের কাছে আবেদন করতে হয়।
ব্যবসায়ীদের জন্য কী সমস্যা তৈরি হচ্ছে
কর পরামর্শদাতা সংস্থা ট্যাক্স কানেক্ট অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পার্টনার বিবেক জালানের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সমস্যা শুধু সরকারের হিসেবের খাতাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং যাঁরা ব্যবসা চালাচ্ছেন তাঁদের নগদ টাকার জোগানেও চাপ তৈরি করছে।
“ইনভার্টেড ডিউটি স্ট্রাকচার ঠিক করা, প্রতিযোগিতার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবসায়ীদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সংক্রান্ত চাপ কমানোর জন্য GST কাউন্সিলের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন,” বলে জানিয়েছেন বিবেক জালান।
রফতানি সংক্রান্ত রিফান্ডের বৃদ্ধি নিয়েও একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। দেশের রফতানি বাণিজ্য মোটের উপর স্থিতিশীল থাকলেও রিফান্ড বেড়েছে ৬১.৮ শতাংশ হারে। জালানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর পিছনে স্বল্পমেয়াদি হিসেবের সময়ের ফারাক কাজ করতে পারে, যেখানে আগের কোনও সময়ের রফতানির রিফান্ড এখন প্রক্রিয়া হচ্ছে।
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার। রিফান্ড বৃদ্ধিকে শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখারও কারণ নেই। দ্রুত রিফান্ড মেটানো মানে ব্যবসায়ীদের হাতে আটকে থাকা টাকা তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়া, যা তাঁদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সমস্যাটা রিফান্ড দেওয়াতে নয়, বরং শুরুতেই কেন এত বেশি পরিমাণ কর জমে যাচ্ছে, তার কাঠামোগত কারণেই।
এপ্রিলের রেকর্ডের সঙ্গে তুলনা
শুধু আগস্টের হিসেব দিয়ে গোটা ছবিটা বোঝা যাবে না। এই বছরের এপ্রিলে GST আদায় পৌঁছেছিল ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকায়, যা এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ। জুনে তা ছিল ১ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, জুলাইয়ে ২ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় আগস্টের ১ লক্ষ ৯৯ হাজার কোটি টাকা কিছুটা কম মনে হলেও, তা মূলত জুনের কাছাকাছি একটা স্তরে থিতু হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
অর্থাৎ এটাকে পিছিয়ে পড়া না বলে বলা ভালো, GST আদায় এখন দুই লক্ষ কোটি টাকার আশপাশে একটা স্থিতিশীল অবস্থানে পৌঁছেছে, যদিও প্রতি মাসেই সেই সীমা পেরিয়ে যাওয়ার গতি এখনও তৈরি হয়নি।
মোট থেকে বাদ দিলে হাতে থাকে কত
মোট আদায় থেকে রিফান্ডের অঙ্ক বাদ দিলে সরকারের হাতে সেই মাসে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা থেকেছে, তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। ১ লক্ষ ৯৯ হাজার কোটি টাকার মোট আদায় থেকে ৩১ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা রিফান্ড বাদ দিলে থাকে মোটামুটি ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এই হিসেবটা নিছক সরল বিয়োগ, সরকারের ঘোষিত কোনও আলাদা পরিসংখ্যান নয়, তবে গ্রস আর নেট আদায়ের মধ্যে ফারাকটা বুঝতে এই হিসেব সহায়ক।
উপসংহার
আগস্টের পরিসংখ্যান একদিকে যেমন GST আদায় বৃদ্ধির ইতিবাচক ছবি তুলে ধরছে, তেমনই রিফান্ডের বাড়বাড়ন্ত এবং আমদানি নির্ভরতা নিয়ে কিছু প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে। ইনভার্টেড ডিউটি স্ট্রাকচারের মতো কাঠামোগত সমস্যা ঠিক না হলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলির উপর চাপ থেকেই যাবে বলে মনে করছেন কর বিশেষজ্ঞরা। আগামী দিনে GST কাউন্সিল এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে শিল্পমহলের।
