Friday, October 2, 2026

বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সত্ত্বেও ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মসংস্থান বাড়বে মাত্র ০.০২ শতাংশ, বলছে ক্রেডিট রেটিং সংস্থাটি।

অর্থনীতি ডেস্ক: গত এক বছরে ভারতের ডেটা সেন্টার শিল্পে ঘোষণা হয়েছে আড়াইশো বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ। অথচ Moody’s এর নতুন রিপোর্ট বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বিশাল লগ্নি দেশের GDP তে যোগ করবে মাত্র ০.১৩ শতাংশ, আর কর্মসংস্থান বাড়বে তারও কম, ০.০২ শতাংশ হারে।

দেশে যত প্রযুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা হয়, তার একটা বড় অংশ জুড়ে এখন থাকে ডেটা সেন্টার। বিদেশি প্রযুক্তি সংস্থা থেকে শুরু করে দেশের প্রথম সারির শিল্পগোষ্ঠী, সবাই যেন এই ক্ষেত্রে জমি কিনে রাখতে ব্যস্ত। কিন্তু এত টাকা ঢালার পরেও অর্থনীতির বড় হিসেবে তার প্রভাব ঠিক কতটা, সেই প্রশ্নের একটা অস্বস্তিকর উত্তর দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা Moody’s।

টাকা ঢালছে সবাই

গত বারো মাসে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী, বিদেশি বড় প্রযুক্তি সংস্থা এবং কিছু তুলনায় ছোট সংস্থা মিলিয়ে ডেটা সেন্টার তৈরির জন্য মোট আড়াইশো বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে।

গুগল এবং আদানি যৌথভাবে বিশাখাপত্তনমে গড়ে তুলছে এক গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টার, খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। প্রায় সমান মাপের আরেকটি প্রকল্প টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেসের, নাম হাইপারভল্ট, বিনিয়োগ প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার, ঘোষণা হয়েছিল ২০২৫ সালের অক্টোবরে।

শুধু এই দুটোই নয়। টাটা সন্স, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, আদানি এন্টারপ্রাইজেস, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এবং এয়ারটেলের মূল সংস্থা ভারতী এন্টারপ্রাইজেসের মতো দেশের প্রায় সব বড় শিল্পগোষ্ঠীই এখন এই দৌড়ে নেমে পড়েছে। স্বাধীন গবেষণা সংস্থা উড ম্যাকেঞ্জি গত ২৭ জুলাই এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সক্রিয় ডেটা সেন্টার ক্ষমতা পৌঁছতে পারে ১২ গিগাওয়াটে।

অথচ হিসেবটা মেলাচ্ছে না Moody’s

এত বিনিয়োগের পরেও Moody’s-এর রিপোর্ট বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টার শিল্প দেশের GDP তে যোগ করবে মাত্র ০.১৩ শতাংশ। কর্মসংস্থানের ছবি আরও কম আশাব্যঞ্জক, আগামী চার বছরে বৃদ্ধি হবে মাত্র ০.০২ শতাংশ হারে।

এশিয়ার অন্য কিছু দেশের সঙ্গে তুলনা করলেই পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে যায়। মালয়েশিয়ায় GDP তে প্রভাব ১.৭৫ শতাংশ, কর্মসংস্থানে ০.৪৬ শতাংশ। সিঙ্গাপুরে GDP তে প্রভাব ০.৬৪ শতাংশ। থাইল্যান্ডে GDP তে ০.২৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানে ০.০৬ শতাংশ। এই তুলনায় ভারতের সংখ্যাগুলো বেশ ছোট দেখাচ্ছে।

ভারতের অর্থনীতিতে ডেটা সেন্টার শিল্পের সম্ভাব্য প্রভাব, কর্মসংস্থান এবং প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনামূলক চিত্র। ছবির উৎস: দ্য কলকাতা হেরাল্ডের সম্পাদকীয় গ্রাফিক্স বিভাগ

কেন এত বড় লগ্নিতেও প্রভাব ছোট দেখাচ্ছে

এর পিছনে বড় কারণ ভারতের অর্থনীতির আকার নিজেই। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠবে, GDP পৌঁছবে প্রায় ৭.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতি এত বড় হলে, একটা নির্দিষ্ট শিল্পের অবদান শতাংশের হিসেবে ছোট দেখানোটাই স্বাভাবিক।

সরল হিসেব করলে, ০.১৩ শতাংশ মানে বছরে মোটামুটি ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের সংযোজন। এই সংখ্যাটা তবে কোনও সরকারি বা Moody’s ঘোষিত চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়, নিছক একটা আনুমানিক হিসেব, যা দিয়ে গোটা অর্থনীতির তুলনায় শিল্পের প্রকৃত আকারটা বোঝা যায়।

সরকারও দিয়েছে ভরসা

বিনিয়োগকারীদের এই উৎসাহে সাড়া দিয়ে কেন্দ্রও এগিয়ে এসেছে। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ডেটা সেন্টার শিল্পের জন্য সম্পূর্ণ কর ছাড়ের ঘোষণা করেন, যাতে আরও বেশি বিনিয়োগ এবং আরও বেশি ক্ষমতা তৈরির পথ প্রশস্ত হয়।

উপসংহার

Moody’s-এর এই রিপোর্ট আসলে একটা সতর্কবার্তার মতো। ডেটা সেন্টার নিয়ে চারদিকে যতই উত্তেজনা থাকুক, দেশের বিশাল অর্থনীতির নিরিখে এই শিল্পের ভূমিকা এখনও তুলনায় ছোট। বিনিয়োগের অঙ্ক আর বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে এই ফারাক থেকেই বোঝা যায়, শুধু বড় বড় প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে বিচার করলে হবে না, আগামী কয়েক বছরে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবে কতটা এবং কত দ্রুত মাটিতে নামে, সেটাই আসল পরীক্ষা।

Leave A Reply

Exit mobile version