Wednesday, August 19, 2026

চার দশক পর নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিলেন। অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারত-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, কৃষি, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসী ভারতীয়দের ভূমিকাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন মোদী। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চল্লিশ বছর পরে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পা রাখলেন কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। অকল্যান্ডে “কিয়া ওরা মোদী” অনুষ্ঠানে দশ হাজারেরও বেশি প্রবাসী ভারতীয়ের সামনে ভাষণ দেন নরেন্দ্র মোদী, আর তাতে বিশেষ ভাবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন নিজেই।

পুরনো মাফলারের গল্প শোনালেন মোদী

ভাষণের শুরুতেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটাই তাঁর প্রথম নিউজিল্যান্ড সফর হলেও, প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে, যখন তিনি কোনও সরকারি পদে ছিলেন না এবং সাধারণ মানুষ তাঁকে চিনতও না, তখনও একবার নিউজিল্যান্ডে আসার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সেই সফরে এক স্থানীয় বন্ধু তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন একটি মাফলার, একটি টুপি এবং একজোড়া দস্তানা— কারণ তখন ছিল শীতের মরসুম। মোদী জানান, সেই মাফলারটি এত বছর পরেও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন তিনি, আর এবারের সফরে বিশেষভাবে সেটি সঙ্গে করে নিয়েও এসেছেন। প্রতীকী এই অঙ্গভঙ্গির মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দুই দেশের সম্পর্ক কতটা দীর্ঘদিনের এবং ব্যক্তিগত।

তাঁর কথায়, ভারত ও নিউজিল্যান্ডের সম্পর্কে রয়েছে স্মৃতি, বন্ধুত্ব, মূল্যবোধ এবং একটি দায়বদ্ধতা। এই সম্পর্ককে তিনি তুলনা করেন নিউজিল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়াকা’ শব্দের সঙ্গে— যা শুধু একটি নৌকার নাম নয়, বরং দুই দেশের যৌথ যাত্রার প্রতীক বলেও অভিহিত করেন তিনি।

প্রবাসী ভারতীয়দের অবদানের প্রশংসা

নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়ের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এই সম্প্রদায় নিউজিল্যান্ডের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। নিজেদের সংস্কৃতি, উৎসব এবং ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের বহুসংস্কৃতির বৈচিত্র্যকেও সমৃদ্ধ করার জন্য প্রবাসী ভারতীয়দের কৃতিত্ব দেন তিনি। বিশেষভাবে উল্লেখ করেন সেবার মনোভাবের কথা— স্বেচ্ছাসেবা, দাতব্য কাজ এবং সমাজকল্যাণে এই সম্প্রদায়ের নজিরবিহীন ভূমিকার প্রশংসা করেন মোদী।

তিনি আরও বলেন, এই সমাবেশ শুধু প্রবাসী ভারতীয়দের একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং ভারত-নিউজিল্যান্ডের বন্ধুত্ব, ক্রীড়া সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিরই উদ্‌যাপন। ২০২৬ সালে দুই দেশের ক্রীড়া সহযোগিতার একশো বছর পূর্ণ হচ্ছে বলে জানিয়ে, ক্রীড়া সম্পর্ক আরও গভীর করার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি। স্থানীয় মাওরি সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী, আর জানান, ভারতও ঐতিহ্য ও উন্নয়নের মেলবন্ধনে একই ধরনের পথ অনুসরণ করছে।

প্রবাসী ভারতীয়দের প্রতি তাঁর আহ্বান, দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এবং সহযোগিতার সেতু হয়ে কাজ চালিয়ে যান তাঁরা, যাতে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারির সম্পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হতে পারে।

কৌশলগত অংশীদারিতে উন্নীত সম্পর্ক

শুধু আবেগঘন ভাষণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই সফর। অকল্যান্ডে মোদী এবং লাক্সনের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনার পরে ভারত-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারির পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কৃষি, দুগ্ধশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিরক্ষা-নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেছেন দুই নেতা। শিক্ষা, ক্রীড়া এবং সংস্কৃতির মতো ক্ষেত্রেও জনসংযোগ আরও মজবুত করার বিষয়ে সহমত হয়েছেন তাঁরা।

বাণিজ্য সম্মেলনে বিনিয়োগের বার্তা

অকল্যান্ডে ভারত-নিউজিল্যান্ড ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানেও লাক্সনের সঙ্গে যোগ দেন মোদী। সেখানে বিশ্বের অন্যতম বৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে ভারতের উত্থানের কথা তুলে ধরে প্রযুক্তি, দক্ষ কর্মীর যাতায়াত, পরিষেবা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ফিনটেক, মহাকাশ এবং পরিকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুযোগের কথা তুলে ধরেন তিনি।

উপসংহার: বৈশ্বিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও শক্তির রাজনীতির প্রেক্ষাপটে

ভারত-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বের স্তরে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সাফল্য নয়; এটি পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলি আর শুধুমাত্র ভৌগোলিক নৈকট্যের ভিত্তিতে অংশীদার নির্বাচন করছে না। বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয়গুলি এখন পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।

ভারতের জন্য নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে আরও শক্তিশালী করার একটি পদক্ষেপ। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডও ক্রমবর্ধমান ভারতীয় অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী। ফলে এই অংশীদারিত্বকে শুধু বাণিজ্য বা সাংস্কৃতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না; এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।

বাস্তববাদী (Realist) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের আলোকে দেখলে, রাষ্ট্রগুলির প্রধান লক্ষ্য হল নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই অর্থে ভারত ও নিউজিল্যান্ড উভয়েই এমন এক সময়ে সম্পর্ক জোরদার করছে, যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বৈশ্বিক শক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং নতুন অর্থনৈতিক জোটের আবির্ভাব— সবকিছু মিলিয়ে মধ্যম ও উদীয়মান শক্তিগুলিও এখন নিজেদের কৌশলগত অবস্থান সুসংহত করতে চাইছে।

একই সঙ্গে উদারবাদী (Liberal) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই অংশীদারিত্ব প্রমাণ করে যে আধুনিক বিশ্বে সহযোগিতা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং জনগণের মধ্যে সংযোগও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের ভূমিকা দুই দেশের সম্পর্ককে শুধুমাত্র রাষ্ট্রনেতাদের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং বহুমাত্রিক ভিত্তি তৈরি করছে।

ফলে বলা যায়, ভারত-নিউজিল্যান্ড কৌশলগত অংশীদারিত্ব এমন এক সময়ে গড়ে উঠছে যখন বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিক (Multipolar) রূপ নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় নয়, বরং ভবিষ্যতের ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তি-সমীকরণ এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিতে তাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।


সৌজন্যে: প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সরকারি বিবৃতি অবলম্বনে

Leave A Reply

Exit mobile version