কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক: ভারতের সংবিধানকে আমরা সাধারণত দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে জানি। কিন্তু ১৯৫০ সালে কার্যকর হওয়া সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপি ছিল একই সঙ্গে এক অসাধারণ শিল্পকর্ম। তার বিভিন্ন অংশের সূচনায় ভারতীয় ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা দৃশ্য চিত্রিত করা হয়েছিল। Ramayana, Mahabharata, Buddha, Mahavira, Ashoka, Shivaji, Guru Gobind Singh, Rani Lakshmibai, Mahatma Gandhi এবং Netaji Subhas Chandra Bose সহ ভারতের ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় সেখানে স্থান পেয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মৌলিক অধিকারের অংশ অর্থাৎ Part III এর সঙ্গে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের একটি চিত্র যুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে Preamble পৃষ্ঠার অলংকরণের সঙ্গে শিল্পী Beohar Rammanohar Sinha এর নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
ভারতের সংবিধানের কথা উঠলেই প্রথমে মনে আসে Dr B R Ambedkar, Constituent Assembly এবং ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখটি। কিন্তু সংবিধানের ইতিহাসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা আইন ও রাজনীতির বাইরে গিয়ে ভারতীয় শিল্প, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপি শুধু লেখা দিয়ে তৈরি হয়নি। তার পাতাগুলো বিভিন্ন চিত্র, নকশা এবং ঐতিহাসিক দৃশ্য দিয়ে অলংকৃত করা হয়েছিল। স্বাধীন ভারতের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে দেশের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে যুক্ত করার এই প্রচেষ্টা আজও মূল সংবিধানের পাণ্ডুলিপিকে অনন্য করে রেখেছে।
সংবিধানের অলংকরণের দায়িত্বে নন্দলাল বসু
মূল সংবিধানের পাণ্ডুলিপির অলংকরণের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের বিশিষ্ট শিল্পী নন্দলাল বসুর নাম বিশেষভাবে যুক্ত। তাঁর নেতৃত্বে শিল্পীরা ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিভিন্ন পর্যায়কে চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন। সংসদের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মূল পাণ্ডুলিপির বিভিন্ন অংশে ভারতীয় সভ্যতার নানা ঐতিহাসিক পর্যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে সংবিধান শুধু একটি আইনি নথি হিসেবে নয়, ভারতের সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রার একটি দৃশ্যমান দলিল হিসেবেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মৌলিক অধিকারের পাতায় রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ
মূল সংবিধানের Part III নাগরিকদের Fundamental Rights বা মৌলিক অধিকার নিয়ে আলোচনা করে। এই অংশের সঙ্গে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের একটি চিত্র যুক্ত রয়েছে। এই চিত্রকে ঘিরে পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। Tejasvi Surya এবং Supreme Court এর আইনজীবী Suyash Pande তাঁদের একটি মতামতধর্মী লেখায় যুক্তি দিয়েছেন যে মৌলিক অধিকারের অংশে রামের উপস্থিতিকে ন্যায়, কর্তব্য, সমতা এবং মানুষের অধিকার রক্ষার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা যেতে পারে। তাঁদের ব্যাখ্যায় রামের চরিত্রের সঙ্গে রাজধর্ম, ন্যায়বিচার এবং মানুষের কল্যাণের ধারণার একটি সম্পর্ক রয়েছে। তবে এটি তাঁদের মতামত ও ব্যাখ্যা, সংবিধান প্রণেতাদের কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নয়। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনে ঐতিহাসিক তথ্য এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
রামের সঙ্গে সাংবিধানিক মূল্যবোধের তুলনা
Tejasvi Surya এবং Suyash Pande তাঁদের লেখায় রামের চরিত্রের বিভিন্ন দিককে আধুনিক সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁদের মতে, Ramayana এর বিভিন্ন সংস্করণে রামের চরিত্রে ন্যায়, কর্তব্য, সহমর্মিতা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বের নানা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তাঁরা Nishadraj এবং Shabari এর সঙ্গে রামের সম্পর্কের উল্লেখ করে সামাজিক অবস্থানের পার্থক্যের মধ্যেও মর্যাদার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। একইভাবে Vibhishana এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাঁরা আশ্রয়প্রার্থী ও ন্যায়ের সন্ধানকারীর প্রতি সুরক্ষার ধারণাকে আধুনিক rule of law এবং ন্যায়বিচারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে এগুলো রামায়ণের চরিত্র ও ঘটনাবলির একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও দার্শনিক পাঠ, সংবিধান প্রণয়নের সময় Constituent Assembly এর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নয়।
Ram Rajya বলতে কী বোঝায়
রামের চিত্রের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই Ram Rajya এর ধারণাটিও আলোচনায় আসে। Tejasvi Surya এবং Suyash Pande তাঁদের মতামতধর্মী লেখায় Ram Rajya এবং Ramraj এর মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মতে, Ram Rajya বলতে কোনও নির্দিষ্ট শাসকের ব্যক্তিগত শাসন বোঝানো উচিত নয়। বরং এটি এমন একটি রাষ্ট্রের ধারণা, যেখানে মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ব্যাখ্যার সঙ্গে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণার তুলনা করা যায়। ভারতীয় সংবিধান কোনও ব্যক্তি বা রাজবংশকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা তৈরি করেনি। বরং এটি নাগরিককে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে রেখেছে এবং Fundamental Rights এর মাধ্যমে নাগরিকের অধিকারকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দিয়েছে। তাই Ram Rajya এবং আধুনিক constitutional republic এর মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করা মূলত একটি রাজনৈতিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যার বিষয়।
সংবিধানের পাতায় শুধু রাম নন
মূল সংবিধানের শিল্পকর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর বিস্তৃতি। বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যুক্ত চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে Mohenjo Daro, Vedic Ashram, Ramayana, Mahabharata, Buddha, Mahavira, Ashoka, Gupta যুগ, Nataraja, Mahabalipuram, Shivaji, Guru Gobind Singh, Akbar, Rani Lakshmibai, Mahatma Gandhi এবং Netaji Subhas Chandra Bose সহ ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা অধ্যায়। ফলে মূল সংবিধানের শিল্প পরিকল্পনাকে শুধুমাত্র কোনও একটি ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বলে দেখা ঠিক হবে না। বরং ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ ও বহুস্তরীয় ইতিহাসকে একটি ধারাবাহিক শিল্পযাত্রার মাধ্যমে তুলে ধরাই ছিল এই পরিকল্পনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
Beohar Rammanohar Sinha এর অবদান
এই বিশাল শিল্পকর্মের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হল Beohar Rammanohar Sinha। Jabalpur এ জন্ম নেওয়া Sinha ভারতীয় শিল্পজগতের একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী ছিলেন এবং শান্তিনিকেতনের শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংবিধানের Preamble পৃষ্ঠার অলংকরণের সঙ্গে তাঁর নাম বিশেষভাবে জড়িত। বিভিন্ন গবেষণামূলক সূত্রে Preamble পৃষ্ঠার অলংকরণ ও border design এর সঙ্গে Sinha এর কাজের সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর শিল্পীসুলভ স্বাক্ষরও এই পৃষ্ঠাকে ঘিরে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
Preamble এর পাতায় ‘राम’ স্বাক্ষর
Beohar Rammanohar Sinha তাঁর শিল্পকর্মে Devanagari লিপি ব্যবহার করে নিজের স্বাক্ষর করতেন বলে তাঁর কাজ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের Preamble পৃষ্ঠার নিচের অংশে একটি ছোট্ট ‘राम’ স্বাক্ষর দেখা যায়, যা Sinha এর signature হিসেবে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। এই স্বাক্ষরকে ঘিরে একটি জনপ্রিয় কাহিনি প্রচলিত রয়েছে যে শিল্পী নাকি নিজের পারিশ্রমিকের পরিবর্তে সংবিধানের Preamble এ ‘Ram’ নামটি রেখে যাওয়ার সুযোগ চেয়েছিলেন। কিন্তু এই নির্দিষ্ট কথোপকথনের নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক সরকারি প্রমাণ না থাকায় এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে প্রচলিত কাহিনি বা জনশ্রুতি হিসেবে উল্লেখ করাই অধিক নিরাপদ।
‘राम’ স্বাক্ষরের তাৎপর্য
এই ছোট্ট স্বাক্ষরটি অবশ্যই কৌতূহল তৈরি করে। কারণ Preamble হল ভারতীয় সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তার পৃষ্ঠায় শিল্পীর স্বাক্ষর মূল পাণ্ডুলিপির শিল্পগত ইতিহাসকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে ‘राम’ শব্দটিকে শিল্পীর স্বাক্ষর হিসেবে দেখা এবং এটিকে সংবিধানের সাংবিধানিক দর্শনের আনুষ্ঠানিক প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা দুটি আলাদা বিষয়। প্রথমটি শিল্প ও পাণ্ডুলিপির ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত, দ্বিতীয়টি একটি ব্যাখ্যামূলক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান।
২২টি Part এবং ভারতীয় ইতিহাসের চিত্র
১৯৫০ সালে কার্যকর হওয়া মূল সংবিধানে ২২টি Part ছিল। এই বিভিন্ন অংশের সূচনায় ভারতীয় ইতিহাস ও সভ্যতার নানা পর্যায়কে চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এর ফলে সংবিধানের বিভিন্ন আইনি বিষয়ের সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক স্মৃতির একটি দৃশ্যমান সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রাচীন সভ্যতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পর্যন্ত এই শিল্প পরিকল্পনায় ভারতের দীর্ঘ ইতিহাসকে একটি ধারাবাহিকতার মধ্যে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
Prem Behari Narain Raizada এর অসাধারণ calligraphy
সংবিধানের সৌন্দর্যের কথা বলতে গেলে Prem Behari Narain Raizada এর নামও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। মূল ইংরেজি সংবিধানের calligraphy করেছিলেন তিনি। সংসদের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৯ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি এই কাজ শুরু করেন এবং ১৯৫০ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তা সম্পন্ন করেন। তাঁর হাতের লেখা সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিকে এমন একটি নান্দনিক রূপ দিয়েছিল, যা আজও ভারতীয় নথিপত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
একটি সংবিধান, বহু ঐতিহাসিক স্মৃতি
মূল সংবিধানের পাণ্ডুলিপির দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে ভারতের ইতিহাসকে একক কোনও ধারায় সীমাবদ্ধ করা হয়নি। বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্য, রাজবংশ, দার্শনিক ধারা, সামাজিক স্মৃতি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যক্তিত্বকে একই নথির বিভিন্ন অংশে স্থান দেওয়া হয়েছে। রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, মহাবীর, শিবাজি, গুরু গোবিন্দ সিং, রানি লক্ষ্মীবাই, মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ভারতের বহুস্তরীয় ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসে। এই কারণেই সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপি একটি আইনি নথির পাশাপাশি ভারতীয় সভ্যতার দৃশ্যমান স্মারক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
রামের ছবি নিয়ে বিতর্কের আসল জায়গা
সংবিধানের Part III তে রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের ছবি থাকার বিষয়টি নিয়ে বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কেউ এটিকে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বাভাবিক প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। আবার কেউ মনে করেন, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক চরিত্রের আলোচনায় এই ধরনের প্রতীকের উপস্থিতিকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মূল সংবিধানের অলংকরণে ভারতীয় সভ্যতা ও ইতিহাসের বিভিন্ন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রতীককে স্থান দেওয়া হয়েছিল। তাই রামের চিত্রকে আলাদা করে দেখার পাশাপাশি পুরো শিল্প পরিকল্পনাটিকেও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সংবিধান শুধু আইনের বই নয়
ভারতের সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপির দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। এটি কেবল Article, Fundamental Rights, Directive Principles এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিধানের সমষ্টি নয়। এর পাতায় রয়েছে ভারতের অতীতের স্মৃতি, শিল্পীদের তুলির কাজ, একজন দক্ষ calligrapher এর হাতের লেখা এবং দেশের ইতিহাসকে নতুন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা। Preamble এর এক কোণে শিল্পী Beohar Rammanohar Sinha এর ছোট্ট ‘राम’ স্বাক্ষর এই পাণ্ডুলিপির শিল্পগত ইতিহাসকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
কেন এই ইতিহাস আজও গুরুত্বপূর্ণ
আজকের প্রজন্মের কাছে সংবিধান মূলত একটি আইনি ও রাজনৈতিক দলিল। কিন্তু এর মূল পাণ্ডুলিপি দেখলে বোঝা যায়, স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্র নির্মাণের সঙ্গে ইতিহাস ও সংস্কৃতির সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল। সংবিধান আধুনিক গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, সমতা এবং আইনের শাসনের ভিত্তি তৈরি করেছে। একই সময়ে তার মূল পাণ্ডুলিপিতে ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এই দুই দিককে পাশাপাশি দেখলেই বোঝা যায়, ভারতের সংবিধান তৈরি হয়েছিল একদিকে আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামো গড়ে তোলার জন্য, অন্যদিকে একটি বহুমাত্রিক সভ্যতার স্মৃতিকেও নতুন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত রাখার জন্য।
উপসংহার
ভারতের সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপি তাই শুধু দেশের সর্বোচ্চ আইন নয়, এটি একই সঙ্গে ভারতীয় ইতিহাস, শিল্প, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রচিন্তার এক অনন্য দলিল। Part III এর সঙ্গে যুক্ত রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের চিত্রকে কেউ ন্যায়, কর্তব্য ও মানুষের অধিকারের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, আবার কেউ সেটিকে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখতে পারেন। Tejasvi Surya এবং Suyash Pande তাঁদের মতামতধর্মী লেখায় রামের চরিত্র এবং Ram Rajya এর ধারণাকে সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে সেই ব্যাখ্যাকে সংবিধান প্রণেতাদের আনুষ্ঠানিক মত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নথিভুক্ত ইতিহাসের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মূল সংবিধানের পাণ্ডুলিপিতে ভারতের ইতিহাস ও সভ্যতার বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছিল। নন্দলাল বসু, Beohar Rammanohar Sinha এবং Prem Behari Narain Raizada সহ বহু শিল্পী ও কারিগরের সম্মিলিত শ্রমে তৈরি হয়েছিল সেই অনন্য পাণ্ডুলিপি। ফলে সংবিধানের পাতায় থাকা রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের চিত্র কিংবা Preamble এর কোণে থাকা ‘राम’ স্বাক্ষরকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রতীক হিসেবে দেখলে পুরো ইতিহাসটি ধরা পড়ে না। বরং এই পাণ্ডুলিপি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীন ভারতের সংবিধান তৈরি হয়েছিল আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আদর্শ এবং ভারতের দীর্ঘ সভ্যতাগত স্মৃতিকে একই ঐতিহাসিক পরিসরে রেখে। সংবিধানকে বুঝতে হলে তাই তার আইন পড়ার পাশাপাশি তার মূল পাণ্ডুলিপির শিল্পকেও দেখতে হয়।
