সংক্ষিপ্তসার: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত উত্তেজনা ছড়ায়। সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং বহিরাগত প্রবেশের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে থাকা শিল্পী নন্দলাল বসুর নকশা করা ঐতিহাসিক প্রতীকের একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনায় একাধিক ছাত্র আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
কলকাতা ব্যুরো: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি এবং মতের পার্থক্য নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু সেই রাজনৈতিক বিরোধ যখন সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দেয়, তখন বিষয়টি শুধু ছাত্র রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার পরিবেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
গত ১৯ আগস্ট রাতে ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের একটি সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সূত্রপাত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। ২০ আগস্টেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুই পক্ষের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সাধারণ সভা (GB) ঘিরে সংঘর্ষের সূত্রপাত
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে এবিভিপি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সদস্যদের মধ্যে বচসা ও সংঘর্ষ শুরু হয়।
দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা এবং বহিরাগতদের নিয়ে আসার অভিযোগ করেছে। এবিভিপির দাবি, তাদের এক সদস্যের উপর হামলা হয়েছিল। অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, বাইরে থেকে লোক এনে ক্যাম্পাসে অশান্তি তৈরি করা হয়েছিল। এই অভিযোগগুলির প্রকৃত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সংঘর্ষে একাধিক ছাত্র আহত হন। এবিভিপির যাদবপুর শাখার সভাপতি নিখিল দাসও আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
গভীর রাতে ক্যাম্পাসে ঢোকার অভিযোগ
সংযুক্ত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাত সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় ২টার মধ্যে একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের তালা ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর ছাত্র সংগঠনগুলির পতাকা ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, আগুন লাগানো এবং অরবিন্দ ভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করার মতো ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অরবিন্দ ভবনের ভিতরে কয়েকজন ছাত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন বলেও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ছাত্রাবাসেও ঢোকার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় কীভাবে একটি দল গেটের তালা ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারল, তা তদন্তের অন্যতম বিষয় হতে পারে।
৪ নম্বর গেটে ফের উত্তেজনা
বৃহস্পতিবার দুপুরে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি আগের রাতের ঘটনার প্রতিবাদে কর্মসূচি নেয়। অন্যদিকে এবিভিপির পক্ষ থেকেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে মিছিল করা হয়।
সংবাদসূত্র অনুযায়ী, গোলপার্ক থেকে এবিভিপির মিছিল যাদবপুরের ৪ নম্বর গেটের দিকে এগিয়ে যায়। পথে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং ডিম, জলের বোতলসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়ার ঘটনাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত নন্দলাল বসুর ঐতিহাসিক প্রতীক
এই অশান্তির মধ্যেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা সামনে আসে। ৪ নম্বর গেটে থাকা ধাতব প্রতীকটি শিল্পী নন্দলাল বসুর নকশা করা। সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ১৯৪০ এর দশকে তৈরি এই প্রতীক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গেটে ওঠার সময় প্রতীকটির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেটি গেটের ভিতরের দিকে পড়ে যায়। পরে সেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশ তুলে নেওয়া হয়।
তবে প্রতীকটি ঠিক কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, গেট টপকে ঢোকার সময় এবিভিপি সমর্থকদের একাংশের কারণে প্রতীকটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবিভিপি সেই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছে, প্রতীকটি অন্য পক্ষের সদস্যরা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই এই মুহূর্তে প্রতীক ভাঙার জন্য কোনও একটি পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা সমীচীন নয়।
স্বপন দাশগুপ্তর প্রতিক্রিয়া
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন স্বপন দাশগুপ্ত। তাঁর কথায়, “সবথেকে আমার খারাপ লেগেছে যে যাদবপুরের যে Emblem টা, সেটাকে নিয়ে কী রকমভাবে ধ্বংস হয়ে গেল। কিন্তু অসম্মান করা হয়েছে, সেটার কোনও সন্দেহ নেই।” তিনি আরও বলেন, এই প্রতীকটি নন্দলাল বসু তৈরি করেছিলেন এবং এর সঙ্গে যাদবপুরের ইতিহাস ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে।
মহুয়া মৈত্রের তীব্র প্রতিক্রিয়া
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে এবিভিপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেন। মহুয়া মৈত্রের দাবি, এবিভিপির সদস্যরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে গেটের ঐতিহাসিক প্রতীকের উপর দাঁড়িয়েছিলেন এবং সেটি ভেঙে দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই প্রতীকটি নন্দলাল বসুর নকশা করা। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসে আগুন লাগানো, সম্পত্তি নষ্ট করা এবং ছাত্রদের দিকে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। নিজের পোস্টের শেষে তিনি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ইঙ্গিত করে তীব্র রাজনৈতিক মন্তব্যও করেন। তবে মহুয়া মৈত্রের এই বক্তব্যের সমস্ত অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়েছে এমন দাবি করা যাচ্ছে না। প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এবং ক্যাম্পাসে অশান্তি ও ভাঙচুরের বিষয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগও সামনে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য নিয়েও উদ্বেগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে শিক্ষক, ছাত্র এবং প্রাক্তনীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংযুক্ত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
প্রাক্তন উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের একাংশের বক্তব্যের মূল সুর হল, যাদবপুরের পরিচয়ের সঙ্গে স্বাধীন চিন্তা, বিতর্ক এবং মতের আদানপ্রদান গভীরভাবে যুক্ত। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও তা যেন হিংসায় পরিণত না হয়, সেই দাবি উঠেছে। শুধু ভবন বা প্রতীক নয়, ছাত্রদের দেওয়াল লিখন, পতাকা এবং পোস্টারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। সংঘর্ষের সময় সেগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রাতের বেলায় গেট ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশের অভিযোগ, পরদিন পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে মিছিল এগিয়ে আসা এবং গেটের কাছে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, সবকিছুই প্রশাসনের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একটি স্পষ্ট এবং কার্যকর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাব্য ত্রুটি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংযুক্ত তথ্য অনুযায়ী, কমিটিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কোনও সদস্যকে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। প্রস্তাবিত তিন সদস্যের কমিটিতে একজন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, কলকাতার অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য এবং অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ গুণমান নিশ্চিতকরণ বিভাগের অধিকর্তাকে রাখার কথা বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছেও লিখিত অভিযোগ করার কথা জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে ১৯ আগস্ট রাতের ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজ তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এখন নজর তদন্তের দিকে
এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তদন্ত। কে প্রথম সংঘর্ষে জড়িয়েছিল, কারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল এবং নন্দলাল বসুর নকশা করা প্রতীকটি কীভাবে ভাঙল, এই প্রশ্নগুলির উত্তর সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে খোঁজা হবে। এখনও তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়নি। ফলে কোনও পক্ষের অভিযোগকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরা উচিত নয়।
শেষ কথা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অশান্তি শুধুমাত্র দুই ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতা, ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ এবং একটি ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন।
নন্দলাল বসুর নকশা করা প্রতীকের ক্ষতি এই ঘটনার একটি বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যখন হিংসা ও ভাঙচুরে পরিণত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের উপর।
এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে মতের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা, দুটিই সমানভাবে রক্ষা করা জরুরি।


