কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক: নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ হড়পা বানে বিপর্যস্ত বিস্তীর্ণ এলাকা। বরফ, জল, পাথর এবং কাদার প্রবল স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে বদলে গিয়েছে পাহাড়ি জনপদের ছবি। উদ্ধারকাজ চলছে। কিন্তু বিপদ এখনও কাটেনি। নদীর পথে তৈরি হওয়া অস্থায়ী জলাধার বা Barrier Lake ভেঙে গেলে ফের বড় জলস্রোত নামতে পারে। আর সেই আশঙ্কার ছায়া পড়ছে ভারতেও। নেপালের নদীগুলি সীমান্ত পেরিয়ে বিহার ও উত্তরপ্রদেশে ঢোকে। ফলে পাহাড়ের বিপর্যয়ের দিকে নজর রাখছে ভারতের প্রশাসনও।
কয়েক মিনিটেই বদলে গেল পাহাড়ের চেহারা
পাহাড়টা যেন হঠাৎ করেই নেমে এল। প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে নীচের উপত্যকায়। তার অভিঘাতে তৈরি হল প্রবল জলস্রোত। সেই স্রোতের সঙ্গে মিশল কাদা, পাথর, বরফ এবং পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ। সরু পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে সেই মিশ্রণ নেমে এল প্রবল গতিতে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল বিস্তীর্ণ এলাকা। এই ঘটনাকেই অনেক ক্ষেত্রে ‘Himalayan tsunami’ বলা হচ্ছে। সমুদ্রের সুনামির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। পাহাড়ি উপত্যকায় জল, বরফ এবং ধ্বংসাবশেষের অত্যন্ত দ্রুত ও ঘন স্রোতকে বোঝাতেই এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভূমিকম্প নয়, তবু কেন কেঁপে উঠল মাটি?
ঘটনার শুরুতে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সামনে এসেছিল। কিন্তু পরে seismic signal বিশ্লেষণ করে অন্য ছবি পাওয়া যায়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের বিপুল অংশ নীচে আছড়ে পড়ার ফলে যে শক্তি তৈরি হয়, তা ভূমিকম্পের মতো সংকেত তৈরি করে। প্রায় ১২০০ মিটার নীচে সেই পতনের অভিঘাত ছিল এতটাই প্রবল যে seismic monitoring system-এ তা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের মতো ধরা পড়ে। অর্থাৎ মাটির নীচে tectonic plate-এর নড়াচড়া নয়, পাহাড়ের উপর থেকে বিপুল ভরের পতনই ছিল সেই কম্পনের উৎস বলে প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বিপদ এখানেই শেষ নয়
সবচেয়ে বড় চিন্তা এখন নদী। হড়পা বানের সঙ্গে নেমে আসা কাদা ও পাথর কোথাও কোথাও নদীর স্বাভাবিক পথ আটকে দিয়েছে। তৈরি হয়েছে অস্থায়ী জলাধার। বাইরে থেকে দেখতে হ্রদের মতো হলেও এই জলাধারগুলি কতটা স্থায়ী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জলের চাপ বাড়তে থাকলে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। তখন আটকে থাকা জল একসঙ্গে নীচে নেমে আসবে। তৈরি হতে পারে দ্বিতীয় দফার ভয়াবহ জলস্রোত। অর্থাৎ উদ্ধারকাজ চলছে ঠিকই, কিন্তু উদ্ধারকারীদেরও নজর রাখতে হচ্ছে পাহাড়ের উপরের জল এবং নদীর গতিপথের দিকে।
নেপালের বিপদ কেন ভারতেরও চিন্তা?
কারণ নদী সীমান্ত মানে না। ভোতে কোশি থেকে ত্রিশূলী, তার পরে নারায়ণী। নেপালের এই নদী ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ভারতের দিকে নেমে আসে। সীমান্ত পার হওয়ার পর নারায়ণী নদীই গণ্ডক নামে পরিচিত। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নেপালের বিপর্যয়ের পর উত্তরপ্রদেশের মহারাজগঞ্জ এবং কুশীনগর এলাকায় নদী থেকে মৃতদেহ উদ্ধারের খবর সামনে এসেছে। সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরেও মৃতদেহ উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনও মৃতদেহ নেপালের বন্যার জলে ভেসে এসেছে কি না, তা প্রশাসনিক তদন্ত এবং পরিচয় শনাক্তকরণের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব।

গণ্ডক নিয়ে সতর্ক বিহার
নেপালের জলপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত গণ্ডক নদী। ফলে নেপালে প্রবল বৃষ্টিপাত বা আকস্মিক জলপ্রবাহ বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে বিহারেও। এই পরিস্থিতিতে ভাল্মীকিনগরের গণ্ডক ব্যারেজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রদত্ত তথ্যে বলা হয়েছে, জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যারেজের ৩৬টি গেট খোলা হয়েছিল। তবে এটিকে ভারতের দিকে আসন্ন ভয়াবহ বন্যার নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নদীর জলস্তর, বৃষ্টিপাত এবং নেপালের পাহাড়ি এলাকার পরিস্থিতির উপরই পরবর্তী বিপদের মাত্রা নির্ভর করবে।
পাহাড়ে যে স্রোত ‘দেয়াল’, সমতলে তার চেহারা বদলে যায়
নেপালের পাহাড়ি উপত্যকায় জল এবং ধ্বংসাবশেষের গতি ভয়াবহ। সরু উপত্যকা সেই স্রোতকে আরও দ্রুত করে তোলে। কিন্তু ভারতের সমতলে এসে পরিস্থিতি বদলে যায়। নদীর গতি কমে। সঙ্গে থাকা পলি ও কাদা জমতে শুরু করে। নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমতে পারে। তখন বিপদটা আর কয়েক মিনিটের ‘জলের দেওয়াল’ নয়। বরং বাড়তে থাকা জলস্তর, নদীর পাড়ের উপর চাপ এবং নিচু এলাকার প্লাবন হয়ে সামনে আসে। এই কারণেই নেপালের পাহাড়ি বিপর্যয় এবং ভারতের সমতলের বন্যা একই ঘটনা হলেও তার চরিত্র এক নয়।
শুধু বন্যা নয়, বিদ্যুৎ নিয়েও বড় ধাক্কা
নেপালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে পাহাড়ি নদীর সম্পর্ক গভীর। জলবিদ্যুৎ থেকেই দেশের ৯০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ আসে বলে প্রদত্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিপর্যয়ে নেপালের প্রায় ৮ শতাংশ electricity grid ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও। এর প্রভাব পড়তে পারে ভারত নেপাল বিদ্যুৎ বাণিজ্যেও। বর্ষাকালে সাধারণত নেপাল অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ভারতে বিক্রি করতে পারে। কিন্তু পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই রফতানি ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্টো দিকে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে ভারত থেকেই বিদ্যুৎ নিতে হতে পারে নেপালকে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাই শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছতে পারে অর্থনীতি এবং energy security-র প্রশ্নেও।
হিমালয় আসলে কতটা স্থির?
দূর থেকে দেখলে হিমালয় যেন অচল পাথরের দেওয়াল। বাস্তবে তা নয়। ভারতীয় এবং ইউরেশীয় tectonic plate-এর সংঘর্ষে তৈরি এই পর্বতমালা এখনও ভূতাত্ত্বিক ভাবে সক্রিয়। পাহাড়ের বহু অংশ fractured rock দিয়ে তৈরি। তার উপর রয়েছে বরফ এবং হিমবাহ। তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে হিমবাহ পিছিয়ে গেলে এবং জমাট বরফ ও frozen ground দুর্বল হলে কিছু পাহাড়ি ঢাল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। প্রদত্ত বিশ্লেষণে বরফকে পাহাড়ের এক ধরনের ‘natural glue’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও ঠিক হবে না। ভূতত্ত্ব, বৃষ্টিপাত, হিমবাহের অবস্থা এবং মানুষের নির্মাণকাজ সব মিলিয়েই ঝুঁকি তৈরি করে।
বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন
হিমালয়ে উন্নয়ন থামবে না। রাস্তা তৈরি হবে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে, সুড়ঙ্গ তৈরি হবে। প্রশ্ন হল, সেই নির্মাণ কতটা নিরাপদ? পাহাড়ের ঢালে রাস্তা কাটতে গিয়ে বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করতে গিয়ে ভূপ্রকৃতির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে একটি নির্মীয়মাণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রবল জলস্রোতে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। তাই উন্নয়ন এবং পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রশ্নটি ফের সামনে এসেছে।
তিব্বতকে ঘিরে অন্য প্রশ্ন
হিমালয়ের জলভূগোলের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কও কম নয়। তিব্বত থেকে এশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নদীর উৎপত্তি। ব্রহ্মপুত্র বা Yarlung Tsangpo নদীকে ঘিরে চিনের বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভারতসহ downstream দেশগুলির উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, চিনের পরিকল্পিত প্রকল্পটি Three Gorges Dam-এর তুলনায় প্রায় তিন গুণ বড় হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের প্রকল্প নিয়ে আলোচনায় পরিবেশের পাশাপাশি downstream water security, তথ্য আদানপ্রদান এবং আঞ্চলিক কূটনীতির বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য যদি আগে পৌঁছয়, প্রাণ বাঁচতে পারে
হিমালয়ের বিপর্যয়ে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি barrier lake ভেঙে গেলে নীচের জনপদের হাতে হয়তো সতর্ক হওয়ার জন্য খুব বেশি সময় থাকবে না। তাই satellite imagery, ground sensors এবং seismic monitoring-এর গুরুত্ব বাড়ছে। উপগ্রহের ছবি দেখে জলাধারের আয়তন বাড়ছে কি না বোঝা যায়। Ground sensor থেকে বৃষ্টিপাত এবং ভূমিধসের তথ্য পাওয়া যায়। আর seismic data বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্প ও বড় mass movement-এর মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না। তথ্য পৌঁছতে হবে দ্রুত। আর সেই তথ্য পৌঁছতে হবে সীমান্ত পেরিয়ে।
ভারত নেপালের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
নেপালের পাহাড়ে কোনও বড় ঘটনা ঘটলে ভারতের সমতলে বসে তা বোঝার জন্য অপেক্ষা করলে চলবে না। নদীর জল নামার আগেই সতর্ক হতে হবে। সেই জন্য প্রয়োজন real time data sharing। নেপাল, ভারত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিনের মধ্যে নদীর জলস্তর, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ এবং barrier lake সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত ভাগ করে নেওয়ার ব্যবস্থা দরকার। প্রয়োজন হলে আগাম সতর্কতা দিতে হবে নদীর পাড়ের সাধারণ মানুষকেও। কারণ satellite-এর data তখনই কাজে লাগবে, যখন সেই তথ্য মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছবে।
আগেও এসেছে এমন সতর্কবার্তা
হিমালয়ে এমন বিপর্যয়ের নজির রয়েছে। ২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ বন্যা, ২০২১ সালের চামোলি বিপর্যয় এবং ২০২৩ সালের সিকিমের বিপর্যয় দেখিয়েছে, বরফ, জল, পাহাড় এবং নদী একসঙ্গে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। প্রতিটি ঘটনার চরিত্র এক নয়। কিন্তু শিক্ষা একই। হিমালয়কে সাধারণ পাহাড় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এখানে কয়েক মিনিটের পরিবর্তন কয়েক বছরের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
শেষ কথা
নেপালের পাহাড়ে এখন উদ্ধারকাজ চলছে। কেউ খুঁজছেন নিখোঁজ স্বজনকে, কেউ খুঁজছেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে থাকার কোনও চিহ্ন। তার মধ্যেই প্রশাসনের সামনে আরেকটি প্রশ্ন, নদীর উপরে তৈরি হওয়া অস্থায়ী জলাধারগুলি কতটা নিরাপদ? ভারতের জন্যও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। নেপালের পাহাড়ে জল বাড়লে তার প্রভাব নদীর পথে নীচে নামবে। সেই জল গণ্ডক হয়ে পৌঁছতে পারে বিহার ও উত্তরপ্রদেশে। তাই এখনই আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করার কারণ নেই, কিন্তু নজরদারিতে কোনও ঢিলেমিও চলবে না।
এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত একটাই। হিমালয়ের পাহাড় সীমান্ত মানে না। নদীও মানে না। তা হলে বিপদের খবরই বা সীমান্তে আটকে থাকবে কেন? আগাম সতর্কতা, উন্নত monitoring এবং ভারত নেপালের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদানপ্রদানই আগামী দিনে এই ধরনের বিপর্যয়ে প্রাণহানি কমানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।


