সংক্ষিপ্তসার: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘ঋষি অরবিন্দ বিশ্ববিদ্যালয়’ করার দাবি তুলেছেন যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ত্রিগুণা সেন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত একটি জাতীয়তাবাদী সম্মেলন থেকে এই দাবি সামনে আসে। প্রয়োজন হলে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, উচ্চশিক্ষা দফতর এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এই দাবিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। ছাত্র রাজনীতি, মতাদর্শের সংঘাত এবং ক্যাম্পাসের আন্দোলন বহু বছর ধরেই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। সাম্প্রতিক ছাত্র সংঘাতের আবহের মধ্যেই এবার সেই বিতর্কে যুক্ত হল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিগুণা সেন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত জাতীয়তাবাদী সম্মেলনে বিজেপির যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘ঋষি অরবিন্দ বিশ্ববিদ্যালয়’ করা হোক। তাঁর বক্তব্য, এই প্রতিষ্ঠানের জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের শিকড়ের সঙ্গে ঋষি অরবিন্দের গুরুত্বপূর্ণ যোগ রয়েছে।
কেন নাম পরিবর্তনের দাবি?
শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাস। তাঁর দাবি, ঋষি অরবিন্দের ভাবনা ও আদর্শের সঙ্গে যাদবপুরের শিক্ষাগত ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক যোগকে সামনে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঋষি অরবিন্দের নামে করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে ইতিহাসের দিক থেকে বিষয়টি একটু বেশি জটিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি একক কোনও ব্যক্তির হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯০৬ সালে National Council of Education গড়ে ওঠে স্বদেশি আন্দোলনের সময়। এই উদ্যোগের সঙ্গে রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক, ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, রাসবিহারী ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ঋষি অরবিন্দ সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যুক্ত ছিলেন।
ঋষি অরবিন্দ ১৯০৬ সালে Bengal National College এর প্রথম Principal হন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও Bengal Technical Institute এর ধারাবাহিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা পরিকাঠামো তৈরি হয়, তারই উত্তরাধিকার বহন করে ১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ শর্বরীর বক্তব্যে ঋষি অরবিন্দের সঙ্গে যাদবপুরের ঐতিহাসিক সম্পর্কের যে উল্লেখ রয়েছে, তার ভিত্তি রয়েছে। তবে তাঁকে একমাত্র ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্রষ্টা’ বলা ইতিহাসের পুরো ধারাটিকে তুলে ধরে না।
গণস্বাক্ষর সংগ্রহের পরিকল্পনা
শর্বরী মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে এই দাবির সমর্থনে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করা হবে। সেই স্বাক্ষরসহ আবেদন রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতরের কাছে পাঠানোর কথা বলেছেন তিনি। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছেও সেই আবেদন পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন বিধায়ক।
তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে জাতীয়তাবাদ এবং ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশের প্রসঙ্গও জুড়ে রয়েছে। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে জাতীয়তাবাদী বক্তব্য আরও জোরদার করার পক্ষে সওয়াল করেন এবং ক্যাম্পাসে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে তার বিরোধিতার বার্তা দেন। এগুলি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ, কোনও স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।
সাম্প্রতিক সংঘাতের আবহেই নতুন বিতর্ক
এই নাম পরিবর্তনের দাবি এমন সময়ে সামনে এল, যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘাত নিয়ে ইতিমধ্যেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ২০ অগস্টের সংঘর্ষে ABVP এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের একটি অংশে থাকা শিল্পী নন্দলাল বসুর নকশা করা প্রতীকও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পরেই যাদবপুরকে ঘিরে জাতীয়তাবাদ বনাম বামপন্থী রাজনীতির বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বৃহস্পতিবারের সম্মেলনে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিংহও ক্যাম্পাসে Maoism এবং Naxalism এর প্রভাব নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন এবং জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপ জোরদারের কথা বলেন।
পাল্টা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিজেপি বিধায়কের প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার পর বাম শিবির থেকেও পাল্টা প্রতিক্রিয়া এসেছে। SFI এর নেতা সৃজন ভট্টাচার্য ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মন্তব্যকে ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রশাসনিক প্রশ্নে আটকে নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক মতাদর্শ, ক্যাম্পাসের স্বাধীন পরিবেশ এবং যাদবপুরের দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য নিয়ে বিস্তর বিতর্ক।
যাদবপুরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস মূলত Bengal National Education Movement এবং স্বদেশি যুগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাসে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে জাতীয় নিয়ন্ত্রণে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা গড়ে তোলার লক্ষ্য থেকেই National Council of Education তৈরি হয়েছিল।
পরে Bengal Technical Institute National Council of Education এর সঙ্গে যুক্ত হয়। স্বাধীনতার পর সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক বিকাশের পথ ধরেই ২৪ ডিসেম্বর ১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটি কার্যকর করতে গেলে শুধু রাজনৈতিক দাবি যথেষ্ট হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক পরিচয়, প্রশাসনিক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়টিও সামনে আসবে।
সামনে কী?
এই মুহূর্তে শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের দাবি একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব হিসেবেই সামনে এসেছে। গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানোর কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আদৌ পরিবর্তন হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি সিদ্ধান্তের খবর নেই।
যাদবপুরের মতো ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের প্রশ্ন তাই আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। একদিকে ঋষি অরবিন্দের জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে যাদবপুর নামটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের শিক্ষা, গবেষণা এবং ছাত্র রাজনীতির পরিচয়। এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই এখন নতুন করে সামনে এসেছে নামবদলের প্রশ্ন।
উপসংহার
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘ঋষি অরবিন্দ বিশ্ববিদ্যালয়’ করার দাবি আপাতত বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উদ্যোগ। কিন্তু এই দাবির ভিতরে রয়েছে বাংলার জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং বর্তমান সময়ের তীব্র মতাদর্শগত সংঘাত। ঋষি অরবিন্দ যাদবপুরের ঐতিহাসিক শিকড়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মের পেছনে ছিল একাধিক জাতীয়তাবাদী শিক্ষাবিদ ও সমাজনেতার সম্মিলিত উদ্যোগ।
ফলে নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটি শুধু একটি নাম বদলের বিষয় নয়, বরং যাদবপুরের ইতিহাস, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের সূচনা করতে পারে।


