মৌনমুখর ঘোষ: কলকাতার ফুটবলে ডার্বি মানেই আলাদা আবেগ। প্রতিযোগিতা বদলেছে, মাঠ বদলেছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম খেলোয়াড় বদলেছে। কিন্তু মোহনবাগান ও ইস্ট বেঙ্গলের মুখোমুখি লড়াইয়ের উত্তেজনা কখনও কমেনি। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর সেই চেনা দ্বৈরথেরই আরও একটি অধ্যায় লেখা হবে। তবে এবার যুবভারতী নয়, ম্যাচের মঞ্চ বারাসাত স্টেডিয়াম। ২০২৬-২৭ মরসুমের কলকাতা ফুটবল লিগের সুপার সিক্সে বিকেল ৫টায় মুখোমুখি হবে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী।
এই ডার্বির আগে স্বাভাবিকভাবেই ফিরে আসছে ৪-১-এর স্মৃতি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। এই ৪-১ কলকাতা লিগের ফল নয়। ২৩ আগস্ট যুবভারতীতে ডুরান্ড কাপের ফাইনালে ইস্ট বেঙ্গল ৪-১ গোলে হারিয়েছিল মোহনবাগানকে। ২২ বছর পর ডুরান্ড কাপ জয়ের সেই রাতে ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন এডমুন্ড লালরিন্ডিকা। একটি গোল করেছিলেন বিপিন সিং। মোহনবাগানের হয়ে একমাত্র গোলটি এসেছিল মনবীর সিংয়ের পা থেকে।
কিন্তু ৭ সেপ্টেম্বরের ম্যাচ সেই ফাইনালের পুনরাবৃত্তি নয়। এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি ম্যাচ, নতুন প্রতিযোগিতা এবং নতুন পরিস্থিতি। আগের ফলাফল আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে, চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু ৯০ মিনিটের মাঠের লড়াইয়ে তার নিশ্চয়তা নেই।
৪-১-এর পর ইস্ট বেঙ্গলের আত্মবিশ্বাস
ডুরান্ড কাপ ফাইনালের বড় জয় ইস্ট বেঙ্গলের আত্মবিশ্বাস নিঃসন্দেহে বাড়িয়েছে। তার সঙ্গে কলকাতা লিগেও দলটি নিজেদের ছন্দ ধরে রেখেছে। ক্যালকাটা কাস্টমসকে ২-০ এবং খিদিরপুরকে ২-০ হারিয়ে সুপার সিক্সে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে লাল হলুদ শিবির। এই দলের নজরে থাকবেন কয়েকজন তরুণ ফুটবলার।
জাসিন টিকে কলকাতা লিগে ইতিমধ্যেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। জর্জ টেলিগ্রাফ এবং রেলওয়ে এফসির বিরুদ্ধে গোল করে তিনি দেখিয়েছেন, সুযোগ পেলে আক্রমণের শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারেন। গতি এবং সরাসরি আক্রমণে যাওয়ার মানসিকতা ডার্বিতে ইস্ট বেঙ্গলের অন্যতম অস্ত্র হতে পারে।
জোসেফ জাস্টিনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। জর্জ টেলিগ্রাফের বিরুদ্ধে ৩-০ জয়ে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন তিনি। সেট পিসে তাঁর উপস্থিতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই রক্ষণ সামলানোর ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা থাকবে। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলিতে আকাশ হেমব্রম এবং মন্তোষ মাঝিও নজর কেড়েছেন। ক্যালকাটা কাস্টমসের বিরুদ্ধে ২-০ জয়ে মন্তোষ প্রথম গোল করেন এবং আকাশ ব্যবধান বাড়ান। ইউনাইটেড কলকাতার বিরুদ্ধেও আকাশ গোলের খাতা খুলেছিলেন। অর্থাৎ ইস্ট বেঙ্গলের শক্তি শুধু ডুরান্ড কাপ ফাইনালের নায়কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কলকাতা লিগে তরুণ এবং উদীয়মান ফুটবলারদের পারফরম্যান্সও দলটিকে আলাদা আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে।
ডুরান্ডের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে মোহনবাগান
মোহনবাগানের গল্পটা কিছুটা আলাদা। ডুরান্ড কাপ ফাইনালে ১-৪ হারের ধাক্কা সামলাতে বেশি সময় নেয়নি সবুজ মেরুন শিবির। কলকাতা লিগে পরের ম্যাচেই জর্জ টেলিগ্রাফকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে জবাব দিয়েছে তারা। সেই ম্যাচে সুহেল ভাটের হ্যাটট্রিক ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। অ্যালেক্স সাজি, সন্দীপ মালিক এবং অভিষেক সূর্যবংশীও গোলের তালিকায় নাম তুলেছিলেন। ফলে ৭ সেপ্টেম্বরের ডার্বিতে সুহেল ভাটের দিকে নজর থাকবেই। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলিতে তাঁর গোল করার ক্ষমতা মোহনবাগানের আক্রমণকে বাড়তি ধার দিয়েছে। সন্দীপ মালিকও আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তবে শুধু অভিজ্ঞতার দিক থেকে নয়, তরুণদের জন্যও এই ম্যাচ বড় সুযোগ। সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিবান জ্যোতি লস্করের মতো ফুটবলাররা কলকাতা লিগে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। ডার্বির মতো ম্যাচে ভালো পারফরম্যান্স তাঁদের আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়াবে, তেমনই ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মোহনবাগানের কলকাতা লিগের দলে সায়ন, কিয়ান নাসিরি, সুহেল ভাট, সন্দীপ মালিক এবং রোহিত সিংয়ের মতো ফুটবলারদের উপস্থিতি আক্রমণভাগে বেশ কিছু বিকল্প তৈরি করছে।
ডার্বি মানেই শুধু ফুটবল নয়
কলকাতা ডার্বির সঙ্গে বাঙালির দৈনন্দিন সংস্কৃতির সম্পর্ক বহু পুরনো। তাই ম্যাচের আগে আবারও ফিরে আসবে সেই চেনা বিতর্ক, ইলিশ না চিংড়ি। খাবারের টেবিলে দুই পছন্দ নিয়ে যেমন মতভেদ থাকে, তেমনই ফুটবলের প্রশ্নে কলকাতার অনেক পরিবার ভাগ হয়ে যায় সবুজ মেরুন এবং লাল হলুদে। এই আবেগই কলকাতা ডার্বিকে অন্য অনেক ম্যাচের থেকে আলাদা করে।
তবে মাঠে ঢোকার পর ইলিশ বা চিংড়ির কোনও ভূমিকা নেই। সেখানে সিদ্ধান্ত নেবে ফুটবল। মাঝমাঠ কে নিয়ন্ত্রণ করছে, আক্রমণে কে দ্রুত উঠছে, রক্ষণে কে কম ভুল করছে এবং গোলের সামনে কে বেশি কার্যকর হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করবে ম্যাচের ফল।
৪-১ কি মানসিক সুবিধা দেবে ইস্ট বেঙ্গলকে?
ডুরান্ড ফাইনালের ৪-১ জয় ইস্ট বেঙ্গলের কাছে অবশ্যই একটি মানসিক শক্তি। কিন্তু সেই ফলাফলকে কলকাতা লিগের ডার্বিতে সরাসরি টেনে আনা ঠিক হবে না। কারণ দুই ম্যাচের চরিত্র আলাদা। ডুরান্ড কাপের ফাইনাল ছিল নকআউট ম্যাচ। কলকাতা লিগের সুপার সিক্সের এই ম্যাচের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ইস্ট বেঙ্গল চাইবে আগের জয়ের আত্মবিশ্বাস কাজে লাগাতে। মোহনবাগানের লক্ষ্য হবে সেই রাতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি ম্যাচ খেলতে।
বিশেষ করে ম্যাচের শুরুটা দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ডুরান্ড ফাইনালে প্রথমার্ধেই চার গোল হজম করেছিল মোহনবাগান। এবার শুরু থেকেই রক্ষণ সংগঠিত রাখা তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার হতে পারে। অন্যদিকে ইস্ট বেঙ্গল নিশ্চয়ই সেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাইবে, যা তাদের ডুরান্ড ফাইনালে বড় সাফল্য এনে দিয়েছিল।
বারাসাতে নতুন মঞ্চ, পুরনো আবেগ
কলকাতা ডার্বির সঙ্গে যুবভারতীর স্মৃতি দীর্ঘদিনের। কিন্তু ৭ সেপ্টেম্বর সেই পরিচিত দৃশ্যের বদলে বারাসাত স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করেই তৈরি হবে নতুন আবহ। মাঠের আকার বা দর্শকসংখ্যার তুলনা নয়, ডার্বির গুরুত্বই বারাসাতকে সেদিন কলকাতা ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসবে। দুই দলের সমর্থকদের আবেগ এবং মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিলে ম্যাচটিকে আলাদা মাত্রা দিতে পারে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ডুরান্ডের ৪-১ জয়কে কি ইস্ট বেঙ্গল নতুন সাফল্যের আত্মবিশ্বাসে বদলাতে পারবে? নাকি কলকাতা লিগের মঞ্চে মোহনবাগান সেই ফলাফলের জবাব দেবে?
আর তার মধ্যেই হয়তো উঠে আসবে কোনও নতুন নায়কের নাম। কারণ ডুরান্ড কাপের ৪-১ এখন অতীত। ৭ সেপ্টেম্বর বারাসাতে শুরু হবে নতুন গল্প। আগের ম্যাচের হিসাব থাকবে, আবেগ থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার আগে পর্যন্ত জয় কার, তার উত্তর কারও জানা নেই। ডার্বির আসল হিসাব লেখা হবে বারাসাতের ৯০ মিনিটেই।


